কন্ডোমে অনীহা, লজ্জা, কোভিড ধাক্কার পরও ম্যানফোর্সের বিক্রি কেন আকাশছোঁয়া?

Manforce: "বাজারে সব থেকে বেশি চাহিদা চকোলেট, লিচি আর স্ট্রবেরির। শুধু তাই নয়, আল্ট্রা থিন থেকে ডটেড, আমাদের সাধ্যের মধ্যে সবটাই আমরা দিচ্ছি।”

কন্ডোমে অনীহা, লজ্জা, কোভিড ধাক্কার পরও ম্যানফোর্সের বিক্রি কেন আকাশছোঁয়া?
ছবি: ফেসবুক

১৩০ কোটির দেশ। সমস্যা বিবিধ। প্রথমত, ১০০ মাইল অন্তর অন্তর পরিবর্তিত জনসংখ্যা! অভ্যাস ও আচরণগত ফারাক তো আছেই, তার ওপর ভারতীয়দের মধ্যে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি লজ্জাবোধ বাড়তি বাধা। বিশেষ করে যখন কন্ডোমের মতো যৌনতা সম্পর্কীয় পণ্যের বিপণন — তখন কাজটা আরও কঠিন। এতদ সত্ত্বেও ভারতে কন্ডোম (Condom) বিক্রিতে ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জনে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত গড়েছে ম্যানকাইন্ড ফার্মা। অবাঞ্ছিত জন্মনিরোধ, নিরাপদ যৌনতা ও নিখাদ সঙ্গম সুখ — এই তিন মন্ত্রেই বাজিমাত ম্যানফোর্সের।

বর্তমান ভারতে কন্ডোম বিক্রির প্রতিযোগিতায় ম্যানকাইন্ড ফার্মা সবার শীর্ষে। ডিউরেক্স (Durex), কামসূত্র (Kamasutra), স্কোর (Skore), মুডস (Moods) – এর সঙ্গে বাজার দৌঁড়ে একে ম্যানফোর্স (Manforce)। নিয়েলসন প্রদত্ত তথ্য (৩১ মার্চ, ২০২১ পর্যন্ত) অনুযায়ী ভারতে কন্ডোম বিক্রির যা বাজার, সেখানে ৩২.৪ শতাংশ স্থান দখল করেছে ম্যানকাইন্ড ফার্মা। দ্বিতীয় স্থানে ডিউরেক্স। তৃতীয় কামসূত্রা। যা ম্যানফোর্সের থেকে এখনও কয়েকশো মাইল দূরে।

 Condom

গ্রাফিক্স: অভিজিৎ বিশ্বাস

ম্যানকাইন্ড ফার্মার ম্যানেজিং ডিরেক্টর রাজীব জুনেজা এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “প্রতিযোগীরা তো বটেই এমনকি সরকারি যে বিজ্ঞাপনগুলো ভারতব্যাপী চলেছে, সেখানে কন্ডোম ব্যবহারে নিরাপদ যৌনতার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিতই ছিল। ক্রেতার মনস্তত্ত্বকে মাথায় রেখে আমরা বিজ্ঞাপন করলাম, যেখান প্রাধান্য পেল কন্ডোম ব্যবহারের যৌন সুখ।” ব্যস, বাজিমাত!

যদিও শুরুতেই কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি ম্যানকাইন্ড ফার্মা। ২০০৭ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে লঞ্চ হয় ম্যানফোর্স। সাফল্য আসে এক দশকেরও পরে। এমনও দিন এসেছে, প্রোডাক্ট বন্ধ করে দেওয়ার কথাও ভেবেছে কোম্পানি। তাহলে কোথায় মোড় ঘুরল?

ম্যানফোর্সের সাফল্য গাথা:

শুরুতেই ম্যানফোর্স লঞ্চ? না, প্রথমেই এতোটা আগ্রাসী হয়নি ম্যানকাইন্ড। জল মেপে, পরীক্ষানীরিক্ষা করার পরেই বাজারজাত হয়েছে কন্ডোম। ম্যানকাইন্ড প্রথমে ভায়গ্রা ট্যাবলেটের সঙ্গে বিনা পয়সায় দিত ম্যানফোর্স। সেটাও কিন্তু সহজ ছিল না। রাজীব জুনেজার কথায়, “যেহেতু সাধারণের কাছে সচেতনতার অভাব ছিল তাই পুরোপুরিভাবে ‘প্রোডাক্ট ডিস্ট্রিবিউশনে’ সময় লেগেছে।” তবে হ্যাঁ, এই পদক্ষেপই ম্যানকাইন্ডকে সাহস জুগিয়েছিল কন্ডোমের বাজারে পা রাখার।

এরপরই কি অ্যাগ্রেসিভ অ্যাডভার্টাইসমেন্ট?

না। এরপরও ধীরে চলো নীতিতেও এগিয়েছে ম্যানকাইন্ড। যৌন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়, সংশয় এবং লজ্জাবোধ, এই প্রতিবন্ধকতাগুলো থেকে চেতনার স্তরকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজেই নিযুক্ত থেকেছে ম্যানফোর্স। কন্ডোম লিকেজ হলে কী হবে? যৌনতৃপ্তিতে ঘাটতি হবে না তো? আসতে থাকে এমন সব প্রশ্নও।

সমস্যা সমাধানে অভিনব পন্থা নিয়ে একেবারে নিবিড় যোগাযোগ তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় ম্যানকাইন্ড। পৌঁছে যায় দুয়ারে দুয়ারে। ভাষার উপর গুরুত্ব দিয়ে তৈরি হয় বিজ্ঞাপন। তারপরই শিরোনামে আসে ম্যানফোর্স।

উদ্ভট প্রচারে সাফল্য যেমন আসে তেমনই জুড়ে যায় বিতর্কও। জুনেজার কথায়, মুম্বই, দিল্লির মতো মহানগরীতে হিন্দি ভাষায় প্রচারই তাদের অর্ধেকটা কাজ করে দেয়। তবে বাংলা, বিহার, ওড়িশায় যে সাফল্য তাঁরা পেয়েছে, তা সত্যিই অভাবনীয় ছিল। সাফল্যের চাকা গড়াতে না গড়াতেই ফের কোভিড চ্যালেঞ্জ।

কোভিডে কন্ডোম বিক্রিতে প্রভাব:

২০২০ সালের প্রথম লকডাউনেই বিরাট ধাক্কা। বিক্রি একেবারে তলানিতে। শুধু ম্যানফোর্সেরই না, গোটা বাজারেই ধস ছিল অপ্রত্যাশিত।

কারণ ব্যাখ্যায় কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর বলেন, এমনিই ভারতীয়রা সরাসরি কন্ডোম কেনায় অনাগ্রহী। পাড়ার দোকান থেকে কন্ডোম কেনার বিষয়ে সিংহভাগই লজ্জা প্রকাশ করে। অফিস যাওয়ার পথে বা বেপাড়া থেকে কন্ডোম কেনার অভ্যাসই ভারতীয়দের মধ্যে বেশি। লকডাউনের কারণে যেহেতু যাতায়তে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, স্বাভাবিক কারণেই সমস্যা তৈরি হয়। যার প্রভাব পড়ে কন্ডোম বিক্রিতেও।

Manforce Condom

গ্রাফিক্স: অভিজিৎ বিশ্বাস

সমস্যা সমাধানের পথ ডিজিটাল:

প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কন্ডোম কোম্পানির সঙ্গ দেয় ডিজিটাল লেনদেন। অতীতে ই-কমার্সে জোর না দিলেও কোভিডে একপ্রকার বাধ্য হয়েই সোশ্যাল প্লাটফর্মে অগ্রসর হয় ম্যানকাইন্ড। আর এখানেই ফের বাজিমাত। কোভিড ধাক্কা পুরোপুরি সামলে উঠতে না পারলেও অনেকটাই শিরদাঁড়া সোজা করা সম্ভব হয়েছে। আত্মবিশ্বাসী ম্যানকাইন্ড এখন মহিলাদের কন্ডোম নিয়ে আসার কথাও ভাবছে।

সুগন্ধি কন্ডোমের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল:   

রাজীব জুনেজা বিশ্বাস করেন কন্ডোমের রকমফের এবং সুগন্ধি ম্যানফোর্সকে আগামী দিনেও সাফল্যের শীর্ষে নিয়ে যাবে। ম্যানফোর্স এখনও পর্যন্ত ১৬ রকমের প্রোডাক্ট এনেছে যার মূল মন্ত্র ‘সুখ ও সুরক্ষা’ (Pleasure & Protection)। তাঁর বক্তব্য, “পান, হ্যাজেলনাট থেকে স্ট্রবেরি, আমরা সবই দিই। বাজারে সব থেকে বেশি চাহিদা চকোলেট, লিচি আর স্ট্রবেরির। শুধু তাই নয়, আল্ট্রা থিন থেকে ডটেড, আমাদের সাধ্যের মধ্যে সবটাই আমরা দিচ্ছি।” আগামীতে ম্যানফোর্স ক্রেতার প্রয়োজনে পরীক্ষা এবং বিশেষ করে ‘টার্গেট গ্রুপ’ জেনারশনের মনমতো ‘কামোত্তজনা’ এবং ‘সুখকর সঙ্গম’-এ পণ্য তৈরিতে বদ্ধপরিকর থাকবে বলেও জানিয়েছেন রাজীব জুনেজা।

বিশ্লেষণ: পর্ন দেখা অপরাধ নয়, তবে আর একটু এগোলেই আপনি ‘অপরাধী’, জেনে নিন ভারতের আইন

Click on your DTH Provider to Add TV9 Bangla