
বলিউডের অলিখিত সম্রাাজ্ঞী হওয়ার অনেক আগেই দক্ষিণ ভারতের তামিল, তেলুগু ও মালায়লাম সিনেমার জগতে সাতের ও আশির দশকে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন শ্রীদেবী। ১৯৮৩ সালে ‘হিম্মতওয়ালা’ ছবির মাধ্যমে বাণিজ্যিক হিন্দি সিনেমায় তাঁর সাড়াজাগানো আত্মপ্রকাশের বহু আগেই দক্ষিণী ছবির সুপারস্টার হিসেবে কোটি কোটি অনুরাগীর হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন তিনি।
আর্ট হাউজ থেকে মূলধারার বাণিজ্যিক— উভয় ধরণের আঞ্চলিক ছবিতেই সমান দক্ষতায় অভিনয় করে তিনি সাধারণ দর্শকের মনে জায়গা করে নেন। একই সঙ্গে নিজেকে একজন উঁচুমানের অভিনেত্রী ও তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। শিশুশিল্পী হিসেবে কেরিয়ার শুরু করার পর সাতের দশকের মাঝামাঝি সময়ে পূর্ণাঙ্গ নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে তাঁর। আর তাঁকে সর্বভারতীয় খ্যাতি ও স্বীকৃতি এনে দিয়েছিল ১৯৭৭ সালের কালজয়ী ছবি ‘১৬ বয়থিনিলে’ (16 Vayathinile)। কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা ভারতীরাজার এটিই ছিল প্রথম পরিচালিত ছবি।
স্টুডিওর চার দেয়াল থেকে সিনেমার শুটিংকে আউটডোরে নিয়ে এসে তামিল চলচ্চিত্র জগতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেছিল ‘১৬ বয়থিনিলে’। ছবিটি তামিল সিনেমার ভিজ্যুয়াল ভাষাটাই বদলে দিয়েছিল। এই প্রথাভাঙ্গা ড্রামা ছবিতে শ্রীদেবী, কামাল হাসান এবং রজনীকান্তের মতো তিন তারকার অসামান্য অভিনয় ও সার্বিক প্রভাব তাঁদের রাতারাতি সাফল্যের নতুন শিখরে পৌঁছে দেয়।
পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালে ভারতীরাজা যখন এই ছবিটিই ‘সোলোঁওয়া সাওয়ান’ (Solva Sawan) নামে হিন্দিতে রিমেক করেন, তখন শ্রীদেবীকেই মূল চরিত্রে নির্বাচন করেন। আর এই ছবির মাধ্যমেই প্রথমবার বলিউডে মুখ্য অভিনেত্রী হিসেবে পা রাখেন শ্রীদেবী। যদিও হিন্দি সিনেমায় তাঁর আসল রাজত্ব শুরু হতে আরও চার বছর সময় লেগেছিল। ‘১৬ বয়থিনিলে’ এবং ‘সোলোঁওয়া সাওয়ান’ ছাড়াও ভারতীরাজার সঙ্গে শ্রীদেবী ‘সিগাপ্পু রোজা ক্কাল’ (১৯৭৮) ছবিতেও কাজ করেছিলেন।
সামান্য কয়েকটি ছবিতে একসঙ্গে কাজ করলেও ভারতীরাজার মনে শ্রীদেবীর অবস্থান ছিল অত্যন্ত উঁচুতে। অভিনেত্রীর প্রয়াণের পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে পরিচালকের গলায় ঝরে পড়েছিল গভীর অনুরাগের সুর।
ভারতীরাজা বলেছিলেন, “তামিল ছবিতে প্রথমবার মূল চরিত্রে সুযোগ পাওয়ার আগে শিশুশিল্পী হিসেবেই বেশ কয়েকটি ছবিতে নিজের অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন শ্রীদেবী। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বেশি দূর না এগোলেও, যেকোনও চরিত্রকে দ্রুত উপলব্ধি করার এবং অত্যন্ত সহজ-সাবলীলভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার এক অবিশ্বাস্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। ওঁর সেই প্রাণখোলা ছোঁয়াচে হাসি আমার স্মৃতি থেকে কোনোদিন মুছবে না। ও সত্যিই এক অনন্য সাধারণ শিল্পী।”
১৯৮৩ সালের পর বলিউডের তাবড় তাবড় নির্দেশকেরা যখন শ্রীদেবীর সঙ্গে কাজ করার জন্য লাইন দিতে শুরু করেন, তখন এ কথা সত্যিই চমকপ্রদ যে একজন তামিল পরিচালকই প্রথম তাঁকে হিন্দি সিনেমার আঙিনায় নিয়ে এসেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, শুরুতে বলিউডে পা রাখতেই চাননি শ্রীদেবী; এমনকী, ‘সোলোঁওয়া সাওয়ান’ ছবির প্রস্তাবও ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে ভারতীরাজার ওপর ওঁর অগাধ ভরসা ছিল। পরিচালক নিজেই তাঁকে সাহস জোগান এবং সবকিছুর দায়িত্ব নিজে নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে শ্রীদেবীকে বলিউডে নামতে রাজি করিয়েছিলেন। জানা যায়, শ্রীদেবীর ভয় ছিল বলিউডে আসলে, তিনি হারিয়ে যাবেন অন্যান্য অভিনেত্রীর সঙ্গে লড়াই করতে না পেরে। তবে পরে অবশ্য হয়েছিল উল্টোটাই। বহুকাল যাবৎ শ্রীদেবীই ছিলেন বলিউডের রূপ কি রানি!