
নয়াদিল্লি: ৭১ বছরে মোট ৫টা মামলা। এর মধ্যে ৩টে মামলা পাকিস্তান নিয়ে। আর এই তিনটে মামলার প্রতিটাতেই ভারত জিতেছে। পাকিস্তান হেরেছে। ঠিক বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারত- পাকিস্তান ম্যাচের মত। দ্য হেগের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে ছবিটা বদলাল তিনদিন আগে। সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি মামলায় ভারতের বিরুদ্ধে রায় দিল আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত। দ্য হেগের আদালত বলেছে, এক তরফা সিন্ধু জলবন্টন চুক্তি ভারত খারিজ করতে পারে না। জম্মু ও কাশ্মীরে দুটি জলবিদ্যুত প্রকল্পও ভারতকে কাটছাঁট করতে হবে।
গত বছর ২৩ এপ্রিল পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি স্থগিত রাখার ঘোষণা করেছিল কেন্দ্র। পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার পর ভারতের প্রথম কড়া সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক আদালত বলেছে, ১৪ দিনের মধ্যে ভারতকে পুরনো চুক্তি অনুযায়ী জল ছাড়তে হবে। আদালতের রায় জানার পরই ভারত সাফ বলে দেয়, এই আদালত অবৈধ। এর অস্তিত্বই আমরা কোনওদিন মানিনি। আজও মানি না। ওরা কী বলল কিছু আসে যায় না। আমরা জল ছাড়ছি না।
ভারত নিজেও তো বিভিন্ন বিষয়ে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যায়। তা হলে? রায় বিপক্ষে গেল বলেই কী আন্তর্জাতিক আদালতের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে? আদালতের রায় না মানার ফলাফল কী হতে পারে? এব্যাপারে ভারতের অবস্থান খুব স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক আদালতের বিভিন্ন বেঞ্চ আছে। দ্বিপাক্ষিক ইস্যু অর্থাৎ দুটি দেশের মধ্যেকার বিষয় নিষ্পত্তির জন্য ১৯৬৬ সালে তৈরি হয়েছিল স্পেশাল ডিসপিউট রেজেলিউশন বেঞ্চ। ভারত প্রথম থেকেই এই বেঞ্চের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভারত খুব ভালো করেই জানত, পাকিস্তান যে কোনও অছিলায় কাশ্মীর নিয়ে এই আদালতের দ্বারস্থ হবে। তাই আদালতের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা নতুন কিছু নয়।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু দাবি করেছেন, এসব আদালতের রায় মানার দায় ভারতের কোনওদিন ছিল না। আজও নেই। কংগ্রেস আমলে ওরা সব কিছু মেনে নিত বলে আমরাও সেই পথে হাঁটব, সেটা হবে না। আমরা রায়ের কপি বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দিয়েছি। অবসরপ্রাপ্ত বিদেশসচিব শিবশঙ্কর মেননের কটাক্ষ, গত ২০ বছরে হেগের আদালত একশোর বেশি রায় দিয়েছে। আমেরিকা, রাশিয়া একটা রায়ও মানেনি। আর চিনও তো এই আদালতের অস্তিত্বই স্বীকার করে না। আসলে সিন্ধুর জল না পাওয়ায় পাকিস্তানের একটা বড় অংশেই চাষবাস কার্যত বন্ধ।
পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন জলের সংকটে ভুগছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সিন্ধ আর বালোচিস্তান। খাবার ও সেচের জলের জন্য চলছে হাহাকার। ইরিগেশন ক্যানালগুলোয় জলের ঘাটতি আশি শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। পাকিস্তানের মোট কৃষিজাত পণ্যের ৬৭ শতাংশ উৎপাদন করে সিন্ধ প্রদেশ। সব এখন ধ্বংসের মুখে।
সাংহাই কর্পোরেশন সামিটে সিন্ধু চুক্তি নিয়ে সরব হয়েছেন পাক প্রধানমন্ত্রী। বাকি সদস্য দেশগুলোকে তাঁর আবেদন, জলের অধিকার কাড়া যায় না। একে অস্ত্র করে অন্যকে জব্দ করাও মানবতা বিরোধী। আপনাদের এর বিরুদ্ধে সরব হওয়া উচিত। কোনও দেশ পাকিস্তানের আবেদনে সাড়া দেবে কী দেবে না, জানা নেই। তবে একটা কথা, ভারত নিজের অবস্থান থেকে সরছে না। Chenab-Beas Link Tunnel Project-এর কাজও
আগের মতোই চলবে বলে জানাচ্ছে কেন্দ্র। চন্দ্রভাগা নদীর অতিরিক্ত জল টানেলের মাধ্যমে নিয়ে গিয়ে ফেলা হবে বিপাশায়। এজন্য হিমাচল প্রদেশের লাহুল উপত্যকায় বাঁধ দিতে হচ্ছে। ৯ কিলোমিটার সুড়ঙ্গ খোঁড়া হচ্ছে। পরের বছর ১০০ কিলোমিটার খাল কাটা শুরু হবে। সেই কাজটা করবে ন্যাশনাল হাইড্রো-ইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন। গরমে বিপাশা শুকিয়ে যাওয়ায় পঞ্জাব, হরিয়ানায় সেচের জল ঠিকমতো পাওয়া যায় না। চন্দ্রভাগার জল এনে সেই ঘাটতি মেটানো হবে। সঙ্গে ৪ হাজার মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ উত্পাদন কেন্দ্রও তৈরি হবে।
সিন্ধু জলচুক্তি অনুযায়ী এতদিন চন্দ্রভাগার অতিরিক্ত জলের উপর ছিল পাকিস্তানের অধিকার। ভারত চুক্তি স্থগিত করে দেওয়ায় চন্দ্রভাগার জল নিয়ে আর চিন্তা নেই। গত এক বছর ধরে আমাদের দেশের নদীর জল আমাদের দেশের মানুষের কাজে লাগছে। জল আর জলে যাচ্ছে না।