
জলপাইগুড়ি: জীবনের প্রথম উপার্জন নিয়ে অনেকেরই অনেকরকম স্বপ্ন থাকে। ওদেরও ছিল। যদিও ওদের বয়সটা উপার্জনের নয়। কেউ ক্লাস এইটে পড়ে, কারও আবার ক্লাস টেন। বয়স কম হলেও, এমন মন কতজনের হয়? করোনাকালে স্কুলের উদ্যোগে নিজের হাতে কিছু জিনিস তৈরি করেছিল তারা। পরে তা স্কুলের উদ্যোগেই বিক্রি করে টাকা উপার্জন করেছিল। কিন্তু খরচ করেনি। সেই উপার্জনের টাকাই এবার হাসি ফোটাল অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মুখে।
জলপাইগুড়ি সদর ব্লকের গড়াল বাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের বিবেকানন্দ হাই স্কুল। সীমান্ত লাগোয়া এই স্কুলের বেশিরভাগ ছাত্র ছাত্রীই অত্যন্ত গরিব পরিবারের। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ ফাস্ট জেনারেশন লার্নার। জানা গিয়েছে, লকডাউনের সময় স্কুল বন্ধ ছিল। সেইসময় পড়ুয়াদের স্কুল থেকে কিছু টাস্ক বা কাজ দেওয়া হয়েছিল। যেমন নিজের হাতে বিভিন্ন ধরনের গয়না তৈরি করা।
করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবার পর স্কুল শুরু হয়। পড়ুয়ারা তাদের হাতে তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র স্কুলে নিয়ে আসে। তাদের হাতের কাজ দেখে উচ্ছ্বসিত হন শিক্ষকেরা। ২০২৩ সালে স্কুলের তরফে বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে আনন্দ মেলার আয়োজন করা হয়। কয়েকদিন ধরে ওই মেলা চলে। মেলায় প্রচুর ভিড় হয়। পড়ুয়াদের হাতে তৈরি জিনিস ভালই বেচা-কেনা হয়। তার থেকে অর্থও উপার্জন হয়। পড়ুয়ারা সিদ্ধান্ত নেয়, ওই টাকা তারা অযাচিত খরচ করবে না। জমিয়ে রাখবে। লাভের টাকা দিয়ে তারা সামাজিক কাজ করবে।
সেই মতোই, পুজোর মুখে স্কুলের সাহায্যে বিশেষ উদ্যোগ নেয় ছাত্রছাত্রীরা। ওই উপার্জনের টাকা দিয়ে বৃদ্ধাশ্রমের অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য উপহার কেনে তারা। নিজেরা গিয়ে সেই উপহার তাদের হাতে উপহার তুলে দেয়। রাখি পরিয়ে দেয় হাতে। জানা গিয়েছে, উপার্জনের টাকা দিয়ে তাদের জন্য দু’টি স্ট্যান্ড ফ্যান,বিছানার চাদর কেনা হয়। সঙ্গে খাওয়াদাওয়ারও ব্যবস্থা করা হয়।
স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা বলছে, “আমরা চেয়েছিলাম আমাদের এই টাকাটা দিয়ে সমাজের কিছু ভালো হোক। শিক্ষকরাও সেই পরামর্শ দিয়েছিলেন। তারপরই আমরা ভাবলাম কেননা আমরা বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে এই টাকাটা ওনাদের জন্য কিছু ভালো কাজ করা হোক। এই জন্যই আমাদের জমানো টাকা দিয়ে তাঁদের যথাসাধ্য চেষ্টা করলাম।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা আলো সরকার বলেন,”বাচ্চাদের এটা অনেক বড় একটা লার্নিং প্রসেস যে আমাদের বৃদ্ধ বাব-মা, যাঁরা আমাদের অনেক কষ্ট করে বড় করে তোলেন, তাঁদের এইভাবে রেখে যাওয়া, সেই জায়গাটা পর্যন্ত কোনও সন্তানই না পৌঁছয়। কোনও বাবা-মা যেন এখানে না আসে। বাচ্চাদের এটা দেখানোই আমার সবথেকে বড় উদ্দেশ্য ছিল।” এদিকে, পড়ুয়াদের এই কাজের জন্য তাদের দু-হাত তুলে আশীর্বাদ করছে পড়ুয়ারা।