
টলিউডের চলচ্চিত্র মহলে পরিচালক অনীক দত্ত বরাবরই এক স্পষ্টবক্তা এবং আপসহীন ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে বামপন্থী মনস্ক এই পরিচালকের সঙ্গে রাজ্যের প্রাক্তন শাসক দল তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংঘাতের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ এবং বহুল চর্চিত। কেবল সিনেমার পর্দা নয়, একাধিকবার প্রকাশ্য মঞ্চেও সরাসরি খোদ মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পিছপা হননি ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ খ্যাত এই পরিচালক। আর সেই প্রতিবাদের জেরেই বারবার প্রাক্তন শাসকদলের কুনজরে পড়তে হয়েছে তাঁকে, যার খেসারত দিতে হয়েছিল তাঁর সিনেমাকেও। যদিও অনীককে নিয়ে কখনই একটা শব্দও খরচ করেননি মমতা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অনীক দত্তর এই বিতর্কের সূত্রপাত মূলত ২০১৮ সালের কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (KIFF) একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। নন্দন চত্বরে চলচ্চিত্র উৎসবের সময় রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে চারিদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশাল বিশাল ছবি এবং হোর্ডিং দেওয়া হয়েছিল। চলচ্চিত্র উৎসবের মতো একটি আন্তর্জাতিক স্তরের শৈল্পিক মঞ্চে একজন রাজনীতিক তথা মুখ্যমন্ত্রীর এমন অতি-প্রচারে তীব্র আপত্তি জানান অনীক দত্ত। তিনি প্রকাশ্যেই মন্তব্য করেন, চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমার কলাকুশলী বা চলচ্চিত্র জগতের দিকপালদের ছবি থাকা উচিত, কোনও রাজনৈতিক নেত্রীর নয়। পরিচালকের এই মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই ভালোভাবে নেয়নি নবান্ন এবং শাসক শিবিরের অন্দরমহল।
এই বিতর্কের আঁচ গিয়ে পড়ে পরিচালকের কর্মজীবনেও। অন্তত পরিচালকের ঘনিষ্ঠরা এটাই মনে করেন। ২০১৯ সালে মুক্তি পায় অনীক দত্তর বহুল প্রতীক্ষিত ছবি ‘ভবিষ্যতের ভূত’। ছবিটির বিষয়বস্তু ছিল তীব্র রাজনৈতিক এবং সামাজিক স্যাটায়ার, যেখানে পরোক্ষভাবে সমকালীন রাজনীতির নানা দিককে তীব্র ব্যঙ্গ করা হয়েছিল। কিন্তু মুক্তির মাত্র একদিন পরেই কলকাতার প্রায় সমস্ত মাল্টিপ্লেক্স এবং সিনেমা হল থেকে রহস্যজনকভাবে নামিয়ে দেওয়া হয় ছবিটি। অগ্রিম টিকিট কেটেও দর্শকেরা প্রেক্ষাগৃহ থেকে ফিরে যেতে বাধ্য হন। কোনও লিখিত নির্দেশ ছাড়াই এভাবে ছবি প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয় রাজ্য রাজনীতিতে।
সে সময় সায়নী ঘোষ ছবিটির ওপর এই অনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন। অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস-এর সামনে চলচ্চিত্র প্রেমী ও বুদ্ধিজীবীদের আয়োজিত এক প্রতিবাদ সভায় যোগ দিয়ে সায়নী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন, একটি গণতান্ত্রিক দেশে এভাবে শিল্পের টুঁটি চিপে ধরা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, যদি কোনও ছবি সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পেয়ে আইনিভাবে মুক্তি পায়, তবে কোন অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে হল মালিকেরা রাতারাতি সেই ছবি নামিয়ে দিতে বাধ্য হন? তবে সেই সময় তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ করলেও, সেই সায়নী ঘোষ, সময় এগোতেই পট পরিবর্তন করেন। তিনি এখন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ।
সিনেমা মহল থেকে শুরু করে আমজনতা— সকলেই একযোগে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন এবং একে ‘ফ্যাসিবাদী মানসিকতা’ ও ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগের তির সরাসরি ওঠে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের দিকে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে হল থেকে ছবি নামানোর পেছনে কোনও অফিসিয়াল কারণ দেখানো হয়নি, তবে ওয়াকিবহাল মহলের বুঝতে বাকি ছিল না যে চলচ্চিত্র উৎসবে মুখ্যমন্ত্রীর পোস্টার নিয়ে অনীক দত্তর করা মন্তব্য এবং ছবির ভেতরের রাজনৈতিক চাবুকই এই ‘অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা’র আসল কারণ।
পরবর্তীকালে এই জল গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। দেশের সর্বোচ্চ আদালত রাজ্য সরকারকে তীব্র ভর্ৎসনা করে এবং ‘ভবিষ্যতের ভূত’ ছবিটির প্রদর্শন পুনরায় চালু করার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি প্রযোজকদের কুড়ি লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও আদেশ দেয়। আইনি লড়াইয়ে অনীক দত্ত জয়ী হলেও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের সঙ্গে তাঁর এই সংঘাত টলিউডের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে থেকে গিয়েছে।