
সালটা ১৯৮০, ২৪ জুলাই। রাত ৯টা ৩২ মিনিটে আবহাওয়ার মেঘলা আমেজকে ভারী করে দিয়ে কলকাতা শহরের আকাশে-বাতাসে ভেসে এসেছিল সেই এক দুঃসংবাদ—প্রয়াত মহানায়ক উত্তম কুমার। রাজপথে লাখো অনুরাগীর অঝোর অশ্রুধারা আর স্তব্ধ হয়ে যাওয়া টলিউড তখনও মেনে নিতে পারেনি যে বাঙালি জাতির স্বপ্নের নায়ক এভাবে হুট করে বিদায় নেবেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে যা ছিল এক আকস্মিক বজ্রপাত, মহানায়ক নিজে কি তবে বহু আগেই তার আঁচ পেয়েছিলেন? আজ তাঁর মহাপ্রস্থানের সাড়ে চার দশক পেরিয়েও এই এক প্রশ্ন তাড়া করে বেড়ায় তাঁর ঘনিষ্ঠ ও গবেষকদের, যার বীজ লুকিয়ে রয়েছে উত্তমের একটি বিশেষ ব্যক্তিগত ডায়েরির পাতায়।
মহানায়কের অতি ঘনিষ্ঠজনদের কাছে এটা কোনো অজানা বিষয় ছিল না যে উত্তম কুমার সব সময় নিজের কাছে একটি ব্যক্তিগত ডায়েরি রাখতেন। শুটিংয়ের সময়সূচি, ছবির নাম, সম্ভাব্য মুক্তির তারিখ থেকে শুরু করে পেশাগত জীবনের খুঁটিনাটি—সবই তিনি স্বহস্তে নথিভুক্ত করে রাখতেন সেই পাতায়। অথচ ১৯৮০ সালের সেই রহস্যময় ডায়েরিটি ওল্টালে আজও গায়ে কাঁটা দেয়!
ডায়েরির পাতায় জুলাই মাসের ২৩ তারিখ পর্যন্ত সমস্ত কাজের বিবরণ নিখুঁতভাবে লেখা ছিল। অদ্ভুতভাবে, ঠিক তার পরের দিন—অর্থাৎ ২৪ জুলাইয়ের পাতাটি তিনি একেবারেই ফাঁকা রেখেছিলেন! যেন ওই দিনটিতে নিজের জন্য কোনো পরিকল্পনা রাখতেই চাননি তিনি।
রহস্যের এখানেই শেষ নয়। ২৫ জুলাইয়ের পাতায় স্পষ্ট হাতে লেখা ছিল ‘বাঞ্ছারামের বাগান’। কিন্তু অদ্ভুত এক খেয়ালে বা তীব্র কোনো টানে তিনি একটিমাত্র রেখা টেনে সেই লেখাটি কলম দিয়ে কেটে দেন!
সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো সংকেত মিলছিল ২৬ জুলাই এবং তার পরবর্তী কয়েকটির পাতায়। সেখানে কোনো সিনেমার নাম বা শুটিংয়ের হিসাব ছিল না; নিজের হাতে তিনি কয়েকটি পাতাজুড়ে লিখে রেখেছিলেন দুটি শব্দ— ‘বিশ্রাম’ এবং ‘চিরবিশ্রাম’।
হঠাৎ কেন কাজের প্রতি চরম উৎসর্গীকৃত একজন মানুষ নিজের ডায়েরির পাতায় আগাম এভাবে ‘চিরবিশ্রামে’র কথা লিখে রাখবেন? তীব্র শারীরিক অসুস্থতা থেকে তৈরি হওয়া চরম ক্লান্তি, নাকি মৃত্যু ঘিরে কোনো অলৌকিক পূর্বাভাস—ঠিক কী মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে তিনি তা লিখেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর আজও অধরা। মৃত্যুর এতগুলো বছর পর আজও মহানায়কের সেই ডায়েরির প্রতিটি পাতা এক অমীমাংসিত সংকেত বয়ে নিয়ে চলেছে, যা উত্তম কুমারকে ঘিরে থাকা চিরন্তন রহস্যকে আরও একধাপ গভীর করে তোলে।