
ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া যে চেনা চওড়া হাসিটি একসময় কোটি কোটি মানুষকে হাসিয়েছিল, সেই কিশোরের কিন্তু বার বার ফিরে আসে নানা মিমে। মজার কোনও মিম তৈরি হলেই, চায়ের ছোট্ট কাপ হাতে কিশোরের সেই অট্টহাসি, নেটপাড়ার বার বার ভাইরাল হয়ে যায়। তবে জানেন কি, ভাইরাল এই কিশোরের হাসির নেপথ্যে রয়েছে,এক কঠিন লড়াইয়ের গল্প।
কিশোরটির নাম অরুণকুমার। যে অরুণ কুমারকে বিশ্ববাসী একসময় কেবল একটি ‘লাফিং মেম’ হিসেবে চিনেছিল, তাঁর সেই অমলিন হাসির নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল এক নির্মম শৈশব।
জানা যায়, অল্প বয়সেই অভাবের তাড়নায় স্কুলের পাট চুকিয়ে পেটের দায়ে কাজে নামতে হয়েছিল অরুণকে। ঘটনাচক্রে, চা পানের বিরতিতে অরুণের ১৫ সেকেন্ডের একটি হাসির ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিলেন তাঁর মালিক, পেশায় ট্রাক চালক নেহরু। দীর্ঘ যাত্রার ফাঁকে রেকর্ড করা অরুণের সেই নিখাদ ও স্বতঃস্ফূর্ত হাসি রাতারাতি জায়গা করে নেয় নেটিজেনদের দেওয়ালে দেওয়ালে। কোটি কোটি মানুষ সেই ভিডিও দেখে আনন্দ পেলেও, ভিডিয়োর পেছনের মানুষটির বাস্তব লড়াইয়ের খবর জানতেন না প্রায় কেউই।
অরুণের বড় হয়ে ওঠার গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না। পৃথিবী যখন তাঁর হাসিকে কৌতুক বা কন্টেন্ট হিসেবে ব্যবহার করছিল, তখন বাস্তব জীবনে তাঁর লড়াই ছিল অত্যন্ত করুণ। তবে অরুণের জীবনে পরিবর্তন আনেন তাঁর মালিক নেহরু। তিনি নিজেও একসময় সংসারের হাল ধরতে গিয়ে কলেজের পড়া ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। ইন্টারনেটে অরুণকে নিয়ে মাতামাতি দেখে তিনি গভীরভাবে চিন্তা করতে শুরু করেন ছেলেটির ভবিষ্যৎ নিয়ে। নেহরু চাননি, অরুণও তাঁর মতো অশিক্ষার ওই একই বৃত্তে আটকে থাকুক।
সেই মুহূর্ত থেকেই অরুণের জীবনে নেহরু শুধু একজন মালিক হিসেবে নয়, বরং অভিভাবক ও মেন্টরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তিনি অরুণের জন্য বই কিনে দেন, পরীক্ষার ফি মেটান এবং দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় ‘প্রাইভেট ক্যান্ডিডেট’ হিসেবে তাঁর নাম নথিভুক্ত করান।
ধীরে ধীরে তাঁদের সেই চলন্ত ট্রাকটিই হয়ে ওঠে একটা ছোট্ট শ্রেণিকক্ষ। দীর্ঘ সফর ও চা-পানের বিরতির ফাঁকে ফাঁকে নেহরু নিজে হাতে অরুণকে বর্ণমালা থেকে শুরু করে পাটিগণিতের প্রাথমিক পাঠ দিতে থাকেন।
লড়াইয়ের চাপটা মোটেও কম ছিল না। একদিকে পুরো ইন্টারনেট যখন অরুণকে কেবল ১৫ সেকেন্ডের একটি হাস্যরসাত্মক ভিডিওর রূপকার হিসেবে মনে রেখেছিল, অন্যদিকে অরুণ তখন নেপথ্যে নীরব সাধনায় নিজের হারিয়ে যাওয়া পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎকে নতুন করে গড়ে তোলার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। অবশেষে অরুণ ও তাঁর অভিভাবক ট্রাক ড্রাইভার নেহরুর স্বপ্নপূরণ। চলতি বছরের মার্চ মাসে দশম শ্রেণি পাস করল সেই হাসিমুখের কিশোর অরুণ। যাঁর হাসি আজও ঘুরে ফিরে আসে নানা মিমে।