
১৯৮৫ সালের জুলাই মাসের এক সকালে সংবাদপত্রের প্রথম পাতার এই খবরের শিরোনাম স্তব্ধ করে দিয়েছিল গোটা বাংলাকে। খবরটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তেই আকাশ ভেঙে পড়েছিল টলিপাড়ায়। বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন কোটি কোটি অনুরাগী। টলিউডের ‘সোনার প্রতিমা’র জীবনে এমন এক ট্র্যাজেডি নেমে আসবে, তা কে-ই বা ভেবেছিল! প্রিয় মহুয়ার এই পরিণতি দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি তাঁর সহকর্মী ও বন্ধুরা।
কিন্তু শোকের এই আবহের মাঝেই বিনোদন জগতের আনাচে-কানাচে ডালপালা মেলতে শুরু করে গুঞ্জন। মহুয়ার সেই অগ্নিকাণ্ড কি শুধুই এক মারাত্মক দুর্ঘটনা? নাকি এর নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল আত্মহত্যা কিংবা অন্য কোনও ষড়যন্ত্র? এমনকী, সেই সময়ে রটে যায়, পারিবারিক অশান্তির চরম সীমানায় পৌঁছেই নাকি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। আজ এত বছর পরেও মহুয়ার মৃত্যুকে ঘিরে ঘন কুয়াশা কাটেনি। সারা জীবন তাঁকে নিয়ে চর্চা হয়েছে স্ক্যান্ডাল আর রটনা ঘিরে—কখনও সহ-অভিনেতা, আবার কখনও পরিচালকের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে তৈরি হয়েছে কত গল্প। চটকদার খবরের মুখরোচক রসদ হলেও, কেউ কোনওদিন মহুয়ার ভেতরের মানুষটাকে বোঝার চেষ্টা করেননি। কেউ জানতে চাননি তাঁর অন্তরের হাহাকার, তাঁর বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রামের কথা। পরিবারের আর্থিক হাল ধরতে কীভাবে শৈশবের সেই ছোট্ট ‘সোনালি’ নিজেকে তিল তিল করে টলিউডের এক নম্বর নায়িকা ‘মহুয়া’ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, তা ইতিহাসের নেপথ্যেই ঢাকা পড়ে গিয়েছিল।
আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন মহুয়া। চিকিৎসকেরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, প্রথম ৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। চিরকালের লড়াকু সেই মেয়েটি জীবনের শেষ লড়াইয়েও নিজের সবটুকু দিয়ে লড়েছিলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। সব মায়াজাল, সমস্ত রটনা আর বিতর্কের উর্ধ্বে চলে যান তিনি।
মহুয়া রায়চৌধুরীর জীবন নিয়ে লেখা নানা গ্রন্থ থেকে জানা যায়, অদ্ভুত এক জেদ ছিল তাঁর মধ্যে। যেটা একবার মন থেকে স্থির করতেন, তা করেই ছাড়তেন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করার সময়েও তাঁর সেই জেদের সাক্ষী থেকেছিলেন কাছের মানুষেরা। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে মহুয়ার একটা শেষ ইচ্ছা ছিল—তিনি পরিবারকে অনুরোধ করেছিলেন, তাঁর এই অগ্নিদগ্ধ ক্ষতবিক্ষত রূপ যেন বাইরের কেউ না দেখে। পরিবারের লোকজন মহুয়ার সেই শেষ অনুরোধ রক্ষা করেছিলেন। হাসপাতালের সেই ঘরে পরিবার ছাড়া বাকি সকলের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ছিল।
আর মহুয়ার সেই শেষ ইচ্ছার কারণেই তাঁর সঙ্গে শেষ দেখাটুকু করতে পারেননি রুপোলি পর্দার জনপ্রিয়তম জুটি তথা অভিনেতা তাপস পাল। সেই সময়ে টলিউডে তাপস পাল ও মহুয়া রায়চৌধুরী জুটি মানেই একের পর এক ব্লকবাস্টার হিট। সমালোচকেরা মনে করতেন, এই জুটি আগামীতে টলিউডের সব রেকর্ড ভেঙে দেবে। কিন্তু এক নিমেষে মহুয়ার এই মর্মান্তিক পরিণতি সেই সোনালী রসায়নে ছেদ টেনে দিল।
প্রিয় নায়িকাকে দেখতে সেদিন ক্যালকাটা হাসপাতালে ছুটে এসেছিলেন তাপস পাল। ভেতরে শুয়ে মহুয়াও নাকি টের পেয়েছিলেন তাপসের উপস্থিতি। কিন্তু নিজের শেষ কথা রাখতে তিনি রুপোলি পর্দার নায়ককে ভেতরে আসতে দেননি। হাসপাতালের বাইরে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও প্রিয় সহশিল্পীকে শেষবার দেখতে পাননি তাপস।
অবশেষে এল সেই অভিশপ্ত দিন—১৯৮৫ সালের ২২ জুলাই। মাত্র সাত দিনের লড়াই শেষে সবাইকে কাঁদিয়ে চিরদিনের মতো বিদায় নিলেন টলিউডের ‘সোনার প্রতিমা’ মহুয়া রায়চৌধুরী। রেখে গেলেন শুধুই আক্ষেপ আর উত্তরহীন কিছু প্রশ্ন।