হিন্দু মেয়ে সোমাকে বিয়ে করে সমাজে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ছিলেন মীর! কীভাবে পেলেন ফিরে? নিজেই শোনালেন সেই লড়াইয়ের গল্প

Mir Afsar Ali Podcast: সেই ব্যারিটন ভয়েসের নেপথ্যে তখন গুটিয়ে বসেছিল এক লড়াকু মন। যে কিনা দমে যায়নি, বরং নিজেকে অল্প অল্প করে তৈরি করছিল সমাজের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে, তৈরি করছিল নিজের আলাদা পরিচয় বানাতে।

হিন্দু মেয়ে সোমাকে বিয়ে করে সমাজে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ছিলেন মীর! কীভাবে পেলেন ফিরে? নিজেই শোনালেন সেই লড়াইয়ের গল্প

|

Sep 06, 2026 | 2:40 PM

পাত্রের নাম মীর আফসার আলি। পাত্রী সোমা ভট্টাচার্য। বর্তমানে মীর জনপ্রিয় সঞ্চালক, অভিনেতা। অন্যদিকে স্ত্রী সোমা সফল ডাক্তার। তবে যখন এই দুজনের প্রেমের শুরু, একসঙ্গে পথাচলা শুরু, তখন জীবনটা এখনকার মতো মসৃণ ছিল না। তখন সেই সংসারে ছিল সমাজের রক্তলাল চোখের হাতছানি! ভিন্নধর্মে প্রেম, বিয়ে করার জন্য সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না মীর ও সোমা। আজ যে ব্যারিটন ভয়েসে মুগ্ধ সবাই, সেই ব্যারিটন ভয়েসের নেপথ্যে তখন গুটিয়ে বসেছিল এক লড়াকু মন। যে কিনা দমে যায়নি, বরং নিজেকে অল্প অল্প করে তৈরি করছিল সমাজের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে, তৈরি করছিল নিজের আলাদা পরিচয় বানাতে। কেননা, সেই মন বিশ্বাস করত, একমাত্র সফলতাই তাঁর এবং তাঁদের সমস্ত না পারাকে, পারাতে পরিণত করবে। হ্যাঁ, আজকের ‘গপ্পো মীরের ঠেক’-এর সেই মীর, কয়েক বছর আগের রেডিয়ো জকি এবং খাস খবরের সঞ্চালক সেই মীর আফসার আলির শুরুর পথটা ঠিক এমনই লড়াইয়ে ভরা ছিল। বলা ভালো দন্দ্ব ছিল। একদিকে কেরিয়ারের গ্রাফের ক্রমাগত ওঠা-নামা, আরেক দিকে ভিন্নধর্মী মেয়েকে বিয়ে করে সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠা। মীরের কথায়, এই সময়টা ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেশি ‘মেহনতের’ সময়।

কী ঘটেছিল মীরের সঙ্গে? সম্প্রতি সায়নের জনপ্রিয় পডকাস্ট অকপট-এ এসে সেই লড়াইয়ের গল্পটা বলে ফেললেন মীর। মীরের সেই গল্পের শুরুতেই উঠে এল খাস খবরের কথা। যে নিউজ বুলেটিনের হাত ধরেই বাঙালির ড্রয়িং রুমে পরিচিত হলেন মীর আফসার আলি। আর সেই সময় থেকেই কেরিয়ার ও ব্যক্তিগত জীবনের লড়াই শুরু তাঁর। কারণ, সবে তখন হিন্দু ঘরের মেয়ে সোমা ভট্টাচার্যকে বিয়ে করেছেন মীর। আর খুঁজছেন কেরিয়ারের শক্ত জমি।

১৯৯৯ সালের কথা। তখন টিভিতে ‘খাসখবর’-এর মতো সংবাদ বুলেটিন পাঠ করছেন মীর, আবার সকাল সকাল কণ্ঠ ধরছেন আকাশবাণীতে। সেই সময় হিন্দি টেলিভিশনে শেখর সুমনের জনপ্রিয় টকশো ‘মুভস অ্যান্ড শেখর’-এর আদলে তৈরি হয়েছিল একটি অনন্য অনুষ্ঠান—‘মির্চ মশলা’। রেইনবো প্রডাকশনের ব্যানারে নির্মিত এই শো-তে একাধিক সেলিব্রিটির সাক্ষাৎকার রেকর্ড করা হয়েছিল, সম্পন্ন হয়েছিল ২৪টি পর্বের শুটিংও। জনপ্রিয় শো ‘মিরাক্কেল’ বা ‘মির্চি’র অনেক আগেই জন্ম হয়েছিল এই আইডিয়ার।

মীরের কথায়, তখন খাসখবরের মতো কড়া সংবাদের সঞ্চালক যদি পাশাপাশি একটি চটপটে কমেডি টকশো করেন, তবে দর্শক নাকি সংবাদ পাঠক হিসেবে আমাকে আর মেনে নেবেন না! এমন এক আজব ও বোকা যুক্তির বলি হয়ে ক্যানবন্দি থেকে যায় শোটির ২৪টি এপিসোড।

সেই দিনগুলোর কথা মনে করে মীর জানান, কী অমানুষিক খাটাখাটনি যে গিয়েছে তখন! সকালে রেডিও, বিকেলে টিভি খবরের শুটিং আর তারপর রাত ১০টা থেকে ভোর ৪টে-৫টা পর্যন্ত চলত ওই টকশোয়ের শ্যুটিং। সেখান থেকে সোজা আবার রেডিও স্টেশনে ছুট। কেরিয়ারের এমন টানাপোড়েনের মাঝেই তাঁর জীবনে চলছিল আরেক কঠিন লড়াই।

তখন সবেমাত্র ভালোবাসার মানুষ মেডিক্যাল পড়ুয়া সোমাকে বিয়ে করেছেন মীর। ভিন্নধর্মী বিয়ের কারণে তৎকালীন সমাজ তাঁদের খুব সহজভাবে মেনে নেয়নি। কোনও পারিবারিক সমর্থন না থাকায় নতুন সংসার পাততে আর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে দুজনকেই মারাত্মক লড়াই করতে হয়েছিল। মীর জানান, সেই দিনগুলোতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই সোমাকে একজন সফল ডাক্তার এবং তাঁকে একজন সফল এন্টারটেইনার হয়ে উঠতে হয়েছিল। আর তারপরই যেন গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায় তাঁদের, অন্তত মীর তেমনটিই মনে করেন।

জীবনের এই দীর্ঘ যাত্রায় নিজের আদর্শ নিয়ে মীরের স্পষ্ট বক্তব্য—”আমি মন্দিরেও যাই না, মসজিদেও যাই না। রেডিও স্টুডিও বা কাজের জায়গাই আমার মন্দির-মসজিদ। কর্মই আমার ধর্ম, কর্মই আমার বর্ম। আমি আমার কাজকে এমন এক জায়গায় দাঁড় করাতে চাই যা অরাজনৈতিক, ধর্ম নিরপেক্ষ এবং সবার জন্য গ্রহণযোগ্য।” জীবনের কোনও অতীত অভিজ্ঞতা নিয়েই আফসোস রাখতে চান না বাঙালির প্রিয় সঞ্চালক, অভিনেতা মীর আফসার আলি ।

 

Loading...
Unable to load recommendations.
Follow Us