
ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যদি এমন কোনও অভিনেতার নাম করতে হয়, যাঁর সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং কণ্ঠস্বর দর্শকদের মনে চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে রয়েছে, তবে সবার আগে উঠে আসবে নানা পাটেকরের নাম। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো যেমন ছিল বৈচিত্র্যময়, তেমনই তাঁর মুখের প্রতিটি লাইন হয়ে উঠেছিল একেকটি কালজয়ী সৃষ্টি। পর্দার বাইরে তাঁর সমাজসেবা বা কার্গিলের অবদান যেমন প্রশংসনীয়, তেমনই রুপোলি পর্দায় তাঁর অনন্য অভিনয় শৈলী আজও অনুরাগীদের হৃদয়ে জীবন্ত। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক নানা পাটেকরের কেরিয়ারের এমন কিছু চলচ্চিত্র ও সংলাপ, যা তাঁকে ভারতীয় সিনে ইতিহাসের অন্যতম সেরা জায়গায় বসিয়েছে।
নানা পাটেকরের ডায়লগ ডেলিভারির কথা উঠলেই সবার আগে মনে পড়ে ১৯৯৪ সালের ছবি ‘ক্রান্তিবীর’-এর কথা। ছবিতে প্রতাপ নারায়ণ তিলক চরিত্রে অভিনয় করে সমাজব্যবস্থার দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছিলেন তিনি। তাঁর সেই বিখ্যাত সংলাপ— “ মুসলমান কা খুন, ইয়ে হিন্দু কা খুন…” আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়কে তুচ্ছ করে মানুষের রক্তের সত্যতাকে তুলে ধরা হয়েছিল।
পাশাপাশি, “আ গয়ে মেরি মউত কা তমাশা দেখনে…” দিয়ে শুরু হওয়া সেই মনোলগ বা একক অভিনয় তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হয়ে রয়েছে। মজার বিষয় হল, ছবির ওই ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যটি নাকি আগে থেকে কোনও প্রথাগত স্ক্রিপ্টে লেখা ছিল না। দৃশ্যটির শুটিংয়ের সময় নানা পাটেকর স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের আবেগকে ভাষা দিয়েছিলেন, যা ভারতীয় সিনেমার অন্যতম স্মরণীয় পারফরম্যান্স।
এক নজরে নানা পাটেকরের সেরা ১০ সংলাপ-
১. “এক মচ্ছর আদমি কো হিজরা বানা দেতা হ্যায়…”- যশওয়ান্ত (১৯৯৭)
২. “আ গয়ে মেরি মৌত কা তমাশা দেখনে…”- ক্রান্তিবীর (১৯৯৪)
৩. “ইয়ে মুসালমান কা খুন, ইয়ে হিন্দু কা খুন… বাতা ইসমে মুসলমান কা কৌন সা, হিন্দু কা কৌন সা?”- ক্রান্তিবীর (১৯৯৪)
৪. “সও মে সে অসি বেঈমান, ফির ভি মেরা ভারত মহান।”- যশওয়ান্ত (১৯৯৭)
৫. “সালা, এই দুখ কাহে খতম নহি হোতা বে!”- ওয়েলকাম (২০০৭)
৬. “মারাঠা মরতা হ্যায় ইয়া মারতা হ্যায়।”- তিরঙ্গা (১৯৯৩)
৭. “ধন্দে মে কোই কিসি কা ভাই নহি, কোই কিসি কা বেটা নহি।”- পরিন্দা (১৯৮৯)
৮. “হাম সব সিস্টেম কা হিস্সা হেই, সিস্টেম ডিসাইড করতা হ্যায়, অপুন ফলো করতা হ্যায়।”-অব তক ছাপ্পান (২০০৪)
৯. “এক সৈনিক কে লিয়ে উস্কা দেশ হি উস্কা পরিবার হোতা হ্যায়।”
১০. “হাম সব এক হি মিট্টি কে বনে হে।”-ক্রান্তিবীর (১৯৯৪)
১৯৯৭ সালের ‘যশওয়ান্ত’ ছবিতে এক সৎ পুলিশ অফিসারের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নানা পাটেকর, যিনি সিস্টেমের ভেতরের পচন ও দুর্নীতির মুখোমুখি হন। এই ছবি থেকেই এসেছিল তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় এক লাইন— “এক মচ্ছর, সালা আদমি কো হিজরা বানা দেতা হ্যায়”। একটি অত্যন্ত সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিষয় কীভাবে একজন মানুষের ক্ষমতা ও মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে, তার এক নির্মম অথচ সরল রূপক ছিল এই সংলাপটি। কোনও রকম মেলোড্রামা বা কৃত্রিম ভঙ্গি ছাড়াই একেবারে সাধারণ ও বিরক্তিকর অথচ সাবলীল ঢঙে এই ডায়লগ বলে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
নানা পাটেকরের একটি বড় গুণ ছিল—চিৎকার না করে কেবল চোখের ইশারা ও গম্ভীর কণ্ঠস্বরে একটা গম্ভীর আবহ তৈরি করা। ‘গুলাম-এ-মুস্তফা’ ছবিতে তাঁর সেই ক্ষমতা পরিপূর্ণভাবে ফুটে উঠেছিল। তাঁর মুখে “মৌত সে বড়্কর কোই দোস্ত নহি হ্যায়…” সংলাপটি চরিত্রের সেই চরম বাস্তববাদী এবং নিয়তিবাদী দর্শনকে ফুটিয়ে তুলেছিল। তথাকথিত বলিউডসুলভ স্টার সুলভ স্টাইল বা গ্ল্যামারের ওপর নির্ভর না করে তিনি সবসময় জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার আলোকে চরিত্রগুলোকে জীবন্ত করে তুলতেন।
২০০৪ সালের পুলিশ ড্রামা ‘অব তক ছাপ্পান’-এ এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট সাধু আগাশে চরিত্রে অন্যরকম এক তীব্রতা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন নানা। ছবির সেই বিখ্যাত লাইন— “হাম সব সিস্টেম কা হিস্সা হে…” ছবির মূল বিষয়বস্তু অর্থাৎ অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করা একজন অফিসার নিজেও সেই সিস্টেমের বাইরে যেতে পারে কি না, সেই দ্বন্দ্বকে সুন্দর ফুটিয়ে তুলেছিল। এছাড়া অপরাধীদের “সমাজ কা কছরা” আর নিজেকে তার “জমাথর” বলে বর্ণনা করার ভঙ্গি প্রমাণ করেছিল যে পুলিশি পেশাকে কতটা নির্মোহভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেন তিনি। এখানে তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল অতিরিক্ত নাটকীয়তার অভাব এবং চমৎকার সংযম।
সিরিয়াস ও অ্যাকশন চরিত্রের পাশাপাশি ২০০৭ সালের কমেডি ছবি ‘ওয়েলকাম’-এ উদয় শেট্টি চরিত্রে অভিনয় করে সম্পূর্ণ এক নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যান নানা পাটেকর। অনিল কাপুরের ‘মজনু ভাই’-এর বিপরীতে এক বদরাগী ডনের চরিত্রে তাঁর খিটখিটে অথচ ডেডপ্যান কমেডি আজও মানুষকে হাসায়। প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে তাঁর এই তীব্র অভিনয় দক্ষতা কমেডির ক্ষেত্রেও সমানভাবে সফল।
হিন্দি ও মারাঠি সিনেমা মিলিয়ে এক বিশাল কেরিয়ারে ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ‘যশওয়ান্ত’, ‘অব তক ছাপ্পান’ এবং ‘ওয়েলকাম’-এর মতো একের পর এক ক্লাসিক উপহার দিয়েছেন তিনি। তবে যখনই মহান এই অভিনেতার কথা মনে পড়বে, তাঁর সেই অনন্য কণ্ঠস্বরই সবার আগে কানে ভেসে উঠবে—যে কণ্ঠ একাধারে রাগে ফুটন্ত, আঘাতপ্রাপ্ত, ব্যঙ্গাত্মক, ভয়ংকর আবার কৌতুকে ভরপুর হতে পারত।