
চলচ্চিত্র জগতে বহু তারকার ভাগ্য রাতারাতি বদলে যায় ঠিকই, কিন্তু এমন কিছু গল্পও থাকে যা আকাশছোঁয়া সাফল্য পাওয়ার পরেও অসম্পূর্ণই থেকে যায়। আজ আমরা আপনাদের এমন এক অভিনেতার কথা বলব, যিনি মাত্র ১২ বছর বয়সে তাঁর দুর্দান্ত অভিনয় দিয়ে গোটা বিশ্বের নজর কেড়েছিলেন। তাঁর অভিনীত প্রথম ছবিই পৌঁছেছিল অস্কারের মঞ্চে, তিনি পেয়েছিলেন জাতীয় পুরস্কার এবং খোদ রাষ্ট্রপতির হাত থেকে নিয়েছিলেন সম্মান। কিন্তু এত কিছুর পরেও ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ পাননি তিনি। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে তাঁকে অভিনয় জগৎ চিরতরে ছেড়ে দিতে হয় এবং আজ পরিবারের পেট চালাতে তিনি অটো চালাতে বাধ্য হচ্ছেন।
কথা হচ্ছে, শফিক সৈয়দের, যিনি মীরা নায়ারের ১৯৮৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘সালাম বম্বে’-তে (Salaam Bombay) কৃষ্ণা বা ‘চা-পাও’ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ছবিটি বক্স অফিসে যেমন সুপারহিট সাব্যস্ত হয়, তেমনই সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র (Best Foreign Language Film) বিভাগে অস্কারের জন্যও মনোনীত হয়। শফিক তাঁর অসামান্য অভিনয়ের জন্য সেরা শিশুশিল্পীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও (National Film Award) লাভ করেন।
শফিকের বাস্তব জীবন কোনও সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়ে কম কিছু ছিল না। ১৯৮০-র দশকে বাড়ি থেকে পালিয়ে বিনা টিকিটে মুম্বই পৌঁছেছিলেন তিনি। চার্চগেট স্টেশনের কাছে রাস্তায় যখন তিনি দিন কাটাচ্ছিলেন, তখন একদিন এক ভদ্রমহিলা তাঁর কাছে আসেন। তিনি শফিক এবং রাস্তায় থাকা অন্যান্য শিশুদের একটি অ্যাক্টিং ওয়ার্কশপে যোগ দেওয়ার বিনিময়ে ২০ টাকা করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। বাকি বাচ্চারা সেখান থেকে পালিয়ে গেলেও, পেটের খিদের জ্বালায় শফিক থেকে গিয়েছিলেন। আর এখান থেকেই তাঁর জীবন বদলে যায় এবং ‘সালাম বম্বে’ ছবিতে তিনি লিড রোল বা প্রধান চরিত্রটি পেয়ে যান।
এক সাক্ষাৎকারে শফিক জানিয়েছিলেন যে, ছবিটির শুটিং চলেছিল ৫২ দিন ধরে এবং এর জন্য তাঁকে ১৫ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেওয়ার কথা ছিল। ছবির অভাবনীয় সাফল্য এবং রাষ্ট্রপতির সাথে ছবি তোলা তাঁর কাছে কোনো স্বপ্নের চেয়ে কম ছিল না। তবে এই স্বপ্ন খুব বেশিদিন টেকেনি। ছবির কাজ শেষ হওয়ার পর প্রায় আট মাস ধরে মুম্বইয়ের নানা প্রযোজক এবং স্টুডিওর দরজায় দরজায় ঘুরেছিলেন তিনি, কিন্তু কেউই তাঁকে কোনো কাজ দেয়নি।
শফিক পরবর্তীতে গৌতম ঘোষের ‘পতঙ্গ’ (Patang) ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন, কিন্তু তাতেও তাঁর কেরিয়ারের গ্রাফ আর ওঠেনি। শেষমেশ ১৯৯৩ সালে তিনি চিরতরে মুম্বই ছেড়ে বেঙ্গালুরুতে ফিরে যান। সেখানে গিয়ে পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতে অটো রিকশা চালানো শুরু করেন। তাঁকে পরিবারের পাঁচজন সদস্যের পেট চালাতে হত যাঁরা তাঁর উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিলেন, অথচ তখন তাঁর দৈনিক রোজগার ছিল মাত্র ১৫০ টাকা। তিনি এও প্রকাশ করেছিলেন যে, দিনের পর দিন কাজ না পাওয়া এবং স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার হতাশায় তিনি দু’বার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন।
২০১৩ সালে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে শফিক আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, তিনি চান না তাঁর সন্তানদের জীবন তাঁর মতো হোক। তাঁর বিশ্বাস, তিনি যদি পড়াশোনাটা করতেন, তাহলে হয়তো চলচ্চিত্রে তাঁর একটা দীর্ঘ কেরিয়ার তৈরি হতে পারত। অবশ্য পরে তিনি অটো চালানো ছেড়ে কন্নড় টিভি সিরিয়ালে টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। তবে আজও তিনি অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করছেন এবং নিরলসভাবে পরিবারের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।