‘সপ্তপদী’র ওথেলোর দৃশ্যে সুচিত্রার জন্য কণ্ঠ দিয়েছিলেন কে জানেন? তাঁর সঙ্গে রয়েছে কাপুর বংশের যোগ

‘সপ্তপদী’ ছবিটির মূল ইউএসপি-ই ছিল উত্তম-সুচিত্রার সেই অনবদ্য রসায়ন। একদিকে একরোখা, জেদি রক্ষণশীল পরিবারের ব্রাহ্মণ সন্তান কৃষ্ণেন্দু, আর অন্যদিকে সাহেবি কায়দায় বড় হওয়া খ্রিস্টান তরুণী রিনা ব্রাউন। দুই ভিন্ন সংস্কৃতির সংঘাত এবং প্রেমের সেই টানাপোড়েন তৎকালীন বাঙালি সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।

সপ্তপদীর ওথেলোর দৃশ্যে সুচিত্রার জন্য কণ্ঠ দিয়েছিলেন কে জানেন? তাঁর সঙ্গে রয়েছে কাপুর বংশের যোগ

|

Jul 18, 2026 | 5:07 PM

বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের ইতিহাস ঘাঁটলে যে জুটির নাম আপামর বাঙালির আবেগ আর ভালোবাসাকে চিরকাল নাড়া দিয়ে যায়, তাঁরা হলেন মহানায়ক উত্তম কুমার (Uttam Kumar) এবং মহানায়িকা সুচিত্রা সেন (Suchitra Sen)। ১৯৬১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই জুটির কালজয়ী ছবি ‘সপ্তপদী’ (Saptapadi) আজও রোমান্টিসিজমের এক অনন্য মাইলফলক। ছবিতে পরিচালক অজয় কর যেভাবে রিনা ব্রাউন আর কৃষ্ণেন্দুর প্রেম, সংঘাত ও ট্র্যাজেডিকে সেলুলয়েডে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা এককথায় ইতিহাস। তবে এই ছবির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল উইলিয়াম শেক্সপিয়রের বিখ্যাত নাটক ‘ওথেলো’ (Othello)-র সেই অবিস্মরণীয় মঞ্চস্থ দৃশ্যটি। যার দিকে অপলক আজও তাকিয়ে থাকা যায়। বিশেষ করে দৃশ্যতে, উত্তম-সুচিত্রার অভিব্যক্তি এবং সঙ্গে কণ্ঠস্বর। পর্দায় মহানায়ক ও মহানায়িকার সেই নিখুঁত ঠোঁট মেলানো আর রাজকীয় অভিনয় দেখে বোঝার উপায় ছিল না যে, নেপথ্যে ওথেলো আর ডেসডিমোনার সংলাপের জন্য অন্য কারও কণ্ঠ ধার করা হয়েছিল। অনেকেই জানেন যে, ওথেলো রূপী উত্তম কুমারের জন্য মেঘগম্ভীর কণ্ঠে ছিলেন উৎপল দত্ত (Utpal Dutt)। কিন্তু ডেসডিমোনা রূপী সুচিত্রা সেনের নেপথ্যে সেই ইংরেজিতে সংলাপ বলা কণ্ঠটি কার ছিল, তা আজও অনেক চলচ্চিত্র প্রেমীর কাছে এক অজানা রহস্য!

‘সপ্তপদী’ ছবিতে রিনা ব্রাউনের চরিত্রে সুচিত্রা সেন যখন মঞ্চে ডেসডিমোনা সেজে নিখুঁত ইংরেজি উচ্চারণে সংলাপ বলছিলেন, নেপথ্যে সেই জাদুকরী কণ্ঠটি দিয়েছিলেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ অভিনেত্রী জেনিফার কাপুর (Jennifer Kapoor)। যিনি পরবর্তীকালে হিন্দি সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেতা শশী কাপুরকে বিয়ে করেন।

সেই সময় জেনিফারের বাবা জিওফ্রে কেন্ডালের নাটকের দল ‘শেক্সপিয়রিয়ানা’ ভারতে ঘুরে ঘুরে শেক্সপিয়রের নাটক মঞ্চস্থ করত। জেনিফার নিজে ইংরেজি নাটকের একজন অসামান্য অভিনেত্রী ছিলেন। ‘সপ্তপদী’ ছবিতে যখন রিনা ব্রাউনের ডেসডিমোনা সাজার সিকোয়েন্স আসে, তখন তাঁর সাহেবি ইংরেজি উচ্চারণের ধারাকে পর্দায় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে পরিচালক অজয় কর জেনিফারকে দিয়ে সুচিত্রা সেনের কণ্ঠ ডাবিং করানোর সিদ্ধান্ত নেন। উৎপল দত্তের ব্যারিটোন ভয়েস এবং জেনিফারের ড্রামাটিক কণ্ঠের সেই যুগলবন্দী পর্দায় উত্তম-সুচিত্রার অভিনয়ের সঙ্গে এমন রাজকীয়ভাবে মিশে গিয়েছিল, যা আজও বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম সেরা মাস্টারপিস দৃশ্য হিসেবে গণ্য হয়।

‘সপ্তপদী’ ছবিটির মূল ইউএসপি-ই ছিল উত্তম-সুচিত্রার সেই অনবদ্য রসায়ন। একদিকে একরোখা, জেদি রক্ষণশীল পরিবারের ব্রাহ্মণ সন্তান কৃষ্ণেন্দু, আর অন্যদিকে সাহেবি কায়দায় বড় হওয়া খ্রিস্টান তরুণী রিনা ব্রাউন। দুই ভিন্ন সংস্কৃতির সংঘাত এবং প্রেমের সেই টানাপোড়েন তৎকালীন বাঙালি সমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।

আজও ‘বাইকে চেপে’ মহানায়কের সেই চিরসবুজ হাসির সঙ্গে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানের রোমান্টিকতা কিংবা পরবর্তীতে কৃষ্ণেন্দুর ফাদার জন হয়ে যাওয়ার সেই ট্র্যাজিক রূপান্তর— দর্শকদের চোখে জল এনে দেয়। উত্তম কুমারের সেই মায়াবী স্ক্রিন প্রেজেন্স আর সুচিত্রা সেনের চোখের তীব্র চাউনি ‘সপ্তপদী’কে শুধু একটা ব্লকবাস্টার ছবি করেনি, বরং বাঙালি সংস্কৃতির এক চিরন্তন নস্টালজিয়ায় পরিণত করেছে।

Follow Us