
মাঠের বাইশ গজ হোক কিংবা টেলিভিশনের পর্দা— তাঁর উপস্থিতি মানেই এক অন্য ম্যাজিক। তিনি বাঙালি তথা ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আইকন, আমাদের সবার প্রিয় ‘দাদা’ সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। ক্রিকেটের ময়দানে তাঁর অফ-সাইডের স্ট্রোক প্লে যেমন শাসন করত বোলারদের, তেমনই রিয়্যালিটি শো ‘দাদাগিরি’-র মঞ্চেও তাঁর সাবলেইল ও রসাত্মক উপস্থাপনা মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত আপামোর দর্শককে। কিন্তু ক্রিকেট বা দাদাগিরির মঞ্চে ছক্কা হাঁকানো এই মানুষটি জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা অর্থাৎ মাধ্যমিকে কেমন ফল করেছিলেন? কত নম্বর পেয়েছিলেন তিনি? সেখানেও কি ছক্কা হাঁকিয়ে ছিলেন সৌরভ? হ্য়াঁ, যে সৌরভ খেলার কারণে পড়াশুনোয় তেমন সময় দিতে পারতেন না, গৃহশিক্ষক যাঁকে নিয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন, এমনকী কাছের বন্ধুরাও মাধ্যমিকে তাঁর পাস হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন— বাইশগজের মতোই সৌরভ কিন্তু মাধ্যমিকেও টুক করে খেলা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন।
ব্যাপারটা একটু খোলসা করে বলা যাক। বেশ কিছুদিন আগে জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো ‘দাদাগিরি’-র মঞ্চে স্বয়ং সৌরভ নিজেই তাঁর মাধ্যমিকের রেজাল্ট এবং সেই সময়ের এক অজানা লড়াইয়ের গল্প খোলসা করেছিলেন।
দাদাগিরির মঞ্চে ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সৌরভ জানান, তাঁরা বেশ কয়েকজন সহপাঠী মিলে প্রধান বাবু নামের এক শিক্ষকের কাছে জীবন বিঞ্জান পড়তেন। সেই ব্যাচে বাকি সবাই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। শিক্ষক প্রশ্ন শুরু করার আগেই তাঁরা উত্তর দিয়ে দিতেন। কিন্তু খেলাধুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সৌরভের প্রস্তুতি ছিল তথৈবচ। প্রশ্নের মুখোমুখি হলেই তিনি কিছুই বলতে পারতেন না। একদিন বিরক্ত হয়ে শিক্ষক সৌরভকে বলেই বসেন, “হবে না এরকম করে। তুমি যাও। তুমি পাস করবে না। মাধ্যমিকে কোনও চান্সই নেই।”
শিক্ষকের মুখে এমন কথা শুনেও দমে যাননি মহারাজ। তিনি স্যারকে অনুরোধ করেন, “না, পাস তো করতে হবে।” সেই সঙ্গে প্রিয় বন্ধু উজ্জ্বল পাশে আছে জানিয়ে স্যারকে কিছু ‘স্পেশাল ক্লাস’ করিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন। আর সেই স্পেশাল ক্লাসের ওপর ভর করেই শুধু পাস করা নয়, বায়োলজিতে রীতিমতো ‘লেটার মার্কস’ তুলে নিয়েছিলেন সৌরভ।
মাধ্যমিক পরীক্ষার ঠিক আগেই এক কঠিন পারিবারিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল সৌরভকে। তাঁর বাবার হার্টের অপারেশনের জন্য মা-বাবা দুজনেই তখন লন্ডনে । বাড়িতে তখন কেবল সৌরভের দিদিমা । বেহালার রায়বাহাদুর রোডের বাসিন্দা এবং সৌরভের নার্সারি জীবনের একেবারে ছোটবেলার বন্ধু সমুদ্র গুপ্ত, যিনি এখন পেশায় চিকিৎসক। সেই সময়ে সৌরভের পাশে ছিলেন। সমুদ্র বাবুর কথায়, “মহারাজের তিনতলার ঘরের পড়াশোনা হতো। আমি মাঝে মাঝে ভাবতাম এই ছেলেটা পাস করবে কীভাবে? এ তো কিছুই করেনি, কিছুই পারে না!”
সারা বছর ক্রিকেট খেলার পর পরীক্ষার আগে বন্ধু সমুদ্রের বাড়ি গিয়ে পড়াশোনা করতেন সৌরভ। আর পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন আসে সেই পরম মুহূর্ত, যা ছিল সবার কল্পনার অতীত। বন্ধু সমুদ্রের ভাষায়, অবিশ্বাস্য! আমরা কেউ ভাবিনি মাধ্যমিকে সৌরভে স্টার পাবে। এটা আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল।” শিক্ষক ও বন্ধুদের সমস্ত সংশয়কে বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়ে মাধ্যমিকে ‘স্টার’ পেয়েছিলেন সৌরভ। এই অভাবনীয় সাফল্যের পর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে সৌরভ দাদাগিরির মঞ্চে হাসতে হাসতে বলেন, “এগুলো হচ্ছে হিডেন ট্যালেন্ট (Hidden Talent), বুঝলি? স্যারদের কাছে অ্যাক্টিং ছিল যে কিছুই জানি না, কিছুই পড়ি না!” জীবনের বাইশ গজে পরিস্থিতি যেমনই হোক, চাপের মুখে মাথা ঠান্ডা রেখে কীভাবে শেষ মুহূর্তে বাজি মারতে হয় এবং ‘দাদা’ হয়ে উঠতে হয়— তা আরও একবার প্রমাণ করলেন মহারাজ।