
বাঙালির হৃদয়ে তাঁর স্থান চিরস্থায়ী। তাঁর এক চিলতে হাসি, তাঁর হেয়ার স্টাইল, ব্যাকব্রাশ, রাজকীয় ব্যক্তিত্ব আর রূপের জাদুতে আচ্ছন্ন ছিলেন তৎকালীন সমস্ত নারী হৃদয়, আজও রয়েছেন। আজও উত্তমের মতো ধুতি-পাঞ্জাবিতে সাজতে চান পুরুষরা। বাঙালিদের কাছে হ্যান্ডসাম নায়ক বলতে উত্তমই শেষ কথা। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মহানায়ক’ উত্তম কুমার। কিন্তু আপনি কি জানেন, পর্দায় বা ছবিতে আমরা উত্তম কুমারের যে উজ্জ্বল রূপ দেখেছি, তা নাকি প্রথম থেকে এমনটা ছিল না? রুপোলি পর্দার এই আইকন নাকি ছিলেন অত্যন্ত কালো!
সম্প্রতি একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে এসে এমনটাই দাবি করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন মহানায়কের নাতনি নবমিতা। শুধু তা-ই নয়, সেই যুগে কোনো আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা ছাড়াই ‘নিধিরাম সর্দার’ ছবির জন্য মোম গলিয়ে মুখে লাগিয়ে কীভাবে অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার, সেই রোমহর্ষক ও কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতার কথাও ফাঁস করেছেন তিনি।
কীভাবে কালো থেকে ফর্সা হয়েছিলেন উত্তম কুমার?
পডকাস্টে সাক্ষাৎকারের সময় নবমিতা স্পষ্ট জানান, দাদুর পুরনো ছবি দেখলে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে কেউ বিশ্বাসই করতে পারবেন না। নবমিতার কথায়, “এটা বললে হয়তো কেউ বিশ্বাস করবে না, তবে দাদু অত্যন্ত কালো ছিলেন। উনি যে কতটা কালো ছিলেন, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ আমার কাছে থাকা ওঁর একদম শুরুর দিকের পুরোনো ছবিগুলো। পরে উনি নিজের ত্বকের মারাত্মক যত্ন নেওয়া শুরু করেন।”
নাতনি জানান, ফর্সা হওয়ার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিয়মিত ক্যাপসুল খেতেন উত্তম কুমার। সেই সঙ্গে বিভিন্ন স্কিন ক্রিম ও বিশেষ সনা (Sauna) থেরাপির মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজের গায়ের রং ঝকঝকে ও উজ্জ্বল করে তুলেছিলেন। নিজের রূপ ও ফিটনেস বজায় রাখতে তিনি কতটা কঠোর পরিশ্রম করতেন, তা এই ঘটনাতেই স্পষ্ট।
বর্তমানে ছবিতে বয়স্ক সাজতে বা বলিরেখা ফুটিয়ে তুলতে শিল্পীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে আধুনিক প্রোসথেটিক (Prosthetics) মেকআপের সাহায্য নেন। কিন্তু ষাট-সত্তরের দশকে এই সুবিধা ছিল না। তরুণ বয়সে ‘নিধিরাম সর্দার’ ছবিতে এক অশীতিপর বৃদ্ধের চরিত্রে অভিনয় করতে হয়েছিল উত্তম কুমারকে। সেই সময়ে চামড়া কুঁচকে বৃদ্ধের রূপ ফুটিয়ে তুলতে যে অমানুষিক কষ্ট তিনি সহ্য করেছিলেন, তা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়!
নবমিতা জানান, “তখন তো প্রোসথেটিক্স ছিল না। তাই মেকআপ রুমে মোমবাতি গলিয়ে সেই গরম মোম দাদুর পুরো মুখে লাগানো হতো। ত্বক টানটান থাকা সত্ত্বেও মুখের চামড়া কুঁচকে বয়স্কদের মতো বলিরেখা (Wrinkles) আনার জন্য গরম মোম মাখা অবস্থাতেই বিশেষ মুখভঙ্গি করে বসে থাকতেন দাদু। মুখের ভেতরটা তখন যন্ত্রণায় জ্বলত।”
নবমিতা আরও জানান, মেকআপের মাঝপথে কোথাও মোম উঠে গেলে আবার গলানো মোম দিয়ে সেই অংশ ভরাট করা হতো। টানা কয়েক ঘণ্টা শুটিং শেষে বাড়ি ফিরে সেই মোম ছাড়ানো ছিল আরও এক ভয়ঙ্কর পরীক্ষা।
ঠান্ডা জল দিয়ে ধীরে ধীরে টেনে টেনে মোম ছাড়াতে গিয়ে মুখ একদম লাল হয়ে রক্তবর্ণ ধারণ করত। প্রতিদিন মুখের ওপর এই অত্যাচার সহ্য করেও হাসিমুখে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতেন তিনি।
ভিডিয়ো সৌজন্যে- চক্র প্রোডাকশন
আজকের যুগে রূপোলি পর্দার তারকাদের চাকচিক্য দেখে অনেকেই প্রলুব্ধ হন। কিন্তু এক কৃষ্ণবর্ণ সাধারণ যুবক থেকে নিজের কঠোর নিষ্ঠা, সাধনা এবং রুপালি পর্দার পেছনের এই অসীম যন্ত্রণা সহ্য করে কীভাবে ‘মহানায়ক’ হয়ে ওঠা যায়— নাতনি নবমিতার মুখে উত্তম কুমারের এই অজানা গল্প যেন তারই প্রমাণ দেয়।