
বাঙালির ঘরে মহানায়ক উত্তম কুমার ও ভবানীপুরের বাড়ির কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আড়ম্বর নিয়ে চর্চা আজও তুঙ্গে। সেই পুজোয় তখনকার টলিউডের নামজাদাদের উপস্থিতির পাশাপাশি স্বয়ং মহানায়ককে দেখা যেত তদারকির কাজে হাত লাগাতে। তবে এ খবর অনেকেরই অজানা যে, বাংলা ইন্ডাস্ট্রির প্রথম তারকা হিসেবে নিজ বাসভবনে জাঁকজমকপূর্ণ গণেশ পুজোর সূচনা করেছিলেন উত্তম কুমার নিজেই। প্রতি বছর গণেশ চতুর্থীতে তাঁর ময়রা স্ট্রিটের অন্দরে বসত চাঁদের হাট।
কাজের সূত্রে বম্বেতে (বর্তমান মুম্বই) থাকাকালীন মায়ানগরীর গণপতি উৎসবের মহিমা কাছ থেকে দেখেছিলেন মহানায়ক। এমনকী, রাজ কাপুরের বিখ্যাত বাংলোর গণেশ পুজোয় নিমন্ত্রিত হয়ে সেখানকার নিয়মকানুন ও জাঁকজমক দেখে মুগ্ধও হয়েছিলেন। ফলে অনেকের ধারণা ছিল, মহানায়ক হয়তো মুম্বইয়ের রীতি মেনেই কলকাতায় গণেশ পুজো শুরু করেন। কিন্তু উত্তমের ঘনিষ্ঠ মহলের গল্পে মেলে এক অলৌকিক ও ভিন্ন ইঙ্গিত।
ঘটনাটি গত শতকের ছয়ের দশকের। বম্বে থেকে সবে কলকাতায় ফিরেছেন মহানায়ক। এক ভোরে হঠাৎ ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে বসেন তিনি, পাশে শুয়ে থাকা সুপ্রিয়া দেবীকে ডেকে তোলেন। আবেগবিহ্বল কণ্ঠে জানান, তিনি স্বপ্নে বিঘ্নহর্তা শ্রী গণেশের দর্শন পেয়েছেন এবং ময়রা স্ট্রিটের ফ্ল্যাটেই গণপতি বাপ্পাকে প্রতিষ্ঠা করার ঐশ্বরিক নির্দেশ পেয়েছেন।
যেমন ভাবনা, তেমনই কাজ! স্বপ্নের কথা মেনে দ্রুত ময়রা স্ট্রিটের ঠাকুরঘরে প্রতিষ্ঠিত হয় গণেশ মূর্তি। মহারাষ্ট্রের গণপতির অবয়ব হুবহু নকল না করে, স্বপ্নে দেখা রূপ অনুযায়ী গণেশের রূপসজ্জায় রাখা হয়েছিল নিখাদ বাঙালিয়ানা। কোনো পুরোহিত ডেকে নয়, প্রতিদিন ভোরে হাওড়া ফুলবাজার থেকে আসা তাজা পদ্ম ও জুঁইয়ের মালায় গণেশের নিত্যপূজা নিজে হাতেই সারতেন উত্তম কুমার। আর নিয়মিত মোদক আসত শহরের বিখ্যাত সতীশ ময়রার দোকান থেকে।
তবে সাধারণ দিনের পুজো আর গণেশ চতুর্থীর উৎসবের মধ্যে ছিল আকাশ-পাতাল তফাত। চতুর্থীর দিন সকালে নিজেই নিখুঁত নিয়মে পুজোয় বসতেন সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরা মহানায়ক। অন্যদিকে হেঁশেল সামলাতেন সুপ্রিয়া দেবী। ভোগের মেনুতে থাকত খিচুড়ি, লাবড়া, পোলাও, আলুর দম, ছানার ডালনা, চাটনি, পায়েস এবং সতীশ ময়রার স্পেশাল মোদক।
আর পুজো শেষে সন্ধে নামলেই বসত চাঁদের হাট ও সংগীতের জলসা। প্রদীপ ও আলোর রোশনাইয়ে সেখানে আসর জমাতেন তৎকালীন টলিউডের খ্যাতনামা শিল্পীরা। শোনা যায়, এমনই এক গণেশ চতুর্থীর পুজো-পরবর্তী জলসায় মহানায়ক উত্তম কুমার ও সুরের জাদুকর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের এক অবিস্মরণীয় যুগলবন্দীর সাক্ষী থেকেছিল গোটা টলিপাড়া।