
রুপোলি পর্দার ‘উত্তম কুমার’ মানেই এক চেনা রাজকীয় হাসি, সম্মোহনী উপস্থিতি আর একের পর এক কালজয়ী সৃষ্টি। কিন্তু রঙিন পর্দার পেছনের মানুষটা কেমন ছিলেন? তাঁর কেরিয়ারের চরম লড়াই, সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে সহবাস, কিংবা ভবানীপুরের নিজের ভিটে ছেড়ে ময়রা স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে চলে আসার ঘটনা— যুগে যুগে গসিপ ম্যাগাজিনের হট টপিক হলেও, নিজেকে সবসময় আড়ালে রাখতেই ভালোবাসতেন মহানায়ক। নিজের ভেতরের টানাপোড়েন বা ব্যাক্তিগত যন্ত্রণা নিয়ে কখনোই প্রকাশ্যে টুঁ-শব্দটি করেননি তিনি। তবে লোকচক্ষুর আড়ালে নিজের জীবনের সব ঘাত-প্রতিঘাত এক গোপন লাল ডায়েরির পাতায় বন্দি করে রেখেছিলেন নায়ক।
ছোট ভাই তথা অভিনেতা তরুণ কুমারের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, উত্তম কুমার প্রতিদিন নিয়ম করে ডায়েরি লিখতেন। পেশাগত জীবন, শুটিংয়ের শিডিউল বা কাজের অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য যেমন ডায়েরি ছিল, তেমনই তাঁর কাছে ছিল আর একটি খাঁটি ‘ব্যক্তিগত’ লাল ডায়েরি। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে ঘরে ফিরে দিনে অন্তত আধঘণ্টা সেই ডায়েরির পাতায় নিজের মনকে ঢেলে দিতেন তিনি। সেখানে সিনেমার আলোর চেয়েও বেশি জায়গা পেত তাঁর জীবনের ঘাম, রক্ত আর নিঃসঙ্গতার কথা। এক সাক্ষাৎকারে মহানায়ক নিজেও এই ডায়েরির অস্তিত্ব স্বীকার করেছিলেন। তবে তিনি চাননি তাঁর মৃত্যুর পর সেই ডায়েরির পাতা কোনও বইয়ের রূপ নিক। তরুণ কুমারকে তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন— তাঁর মৃত্যুর পর যেন সেই লাল ডায়েরি নষ্ট করে দেওয়া হয়। কারণ তিনি চাননি তাঁর জীবনের চরম হতাশা ও দুর্বলতাগুলো বাইরের মানুষের চর্চার বিষয় হোক।
উত্তম কুমারের মানসিকভাবে পিষ্ট হওয়ার সেই দিনগুলোর প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন ভাই তরুণ কুমার। তিনি পরবর্তীতে লিখেছিলেন, ডায়েরিতে ঠিক কী লেখা ছিল তা তিনি অনুমান করতে পারেন। বাড়ির এক বন্ধ ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে মহানায়ক একদিন হা-হুতাশ করে বলে উঠেছিলেন, “আমি ভালো নেই রে! মনে বিন্দুমাত্র শান্তি নেই। বুঝতে পারছি না কী করব… আমার নিজেরও তো একটা ব্যক্তিগত পৃথিবী আছে, সেখানে সবাই কেন অন্যায়ভাবে ঢুকে পড়বে? আমার স্ত্রী, সন্তান, পরিবারকে আমি অন্যদের সঙ্গে এক করে দেখতে পারি না। এই মারাত্মক মানসিক চাপ আর সহ্য হচ্ছে না… আমি মুক্তি চাই, মুক্তি!”
দাদার এই হাহাকার শুনে বন্ধুসম ভাই তরুণ কুমার সেদিন উত্তর দিয়েছিলেন, “এখন আর সেটা সম্ভব নয় রে দাদা। নিজের তৈরি করা জালের ভেতরে তুই নিজেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছিস। তোর আর মুক্তি নেই।”
নিজের এই মানসিক যন্ত্রণা আর জীবনের জটিল কালো অধ্যায়গুলোকে তিনি কখনোই দুনিয়ার সামনে আনতে দেননি। গুঞ্জনে শোনা যায়, ১৯৮০ সালে মহানায়কের চিরবিদায়ের পর রহস্যময় সেই লাল ডায়েরিটি আগুনের শিখায় পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। কে বা কারা সেই ডায়েরিতে আগুন দিয়েছিল, তা আজ অবধি এক পরম রহস্যই রয়ে গিয়েছে।