
বাঙালির আবেগে ভাগাভাগির কমতি নেই— ফুটবলের মাঠে ইস্টবেঙ্গল বনাম মোহনবাগান, পাতের লড়াইয়ে চিংড়ি বনাম ইলিশ, কিংবা রুপোলি পর্দার তুল্যমূল্য বিচারে উত্তম কুমার বনাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। চায়ের কাপে তুফান তোলা এই দ্বৈরথ দশকের পর দশক ধরে বাঙালির আড্ডার মুখ্য রসদ। অনুরাগী মহলে কে সেরা তা নিয়ে যত তরজাই চলুক না কেন, বাস্তব জীবনে উত্তম-সৌমিত্রর রসায়ন ছিল একেবারে অন্যরকম। সৌমিত্র নিজেই বহু সাক্ষাৎকারে আক্ষেপ কিংবা ভালোবাসার সুরে বলতেন, “উত্তমদার সঙ্গে তো আমার প্রেমের সম্পর্ক!” অন্যদিকে সৌমিত্রকে অনুজ ভ্রাতার মতো আগলে রাখতেন উত্তম, ডাকতেন পরম স্নেহের ‘পুলু’ নামে। তবে সেই আদরের ‘পুলু’কে নিয়ে একবার এমন এক কাণ্ড ঘটিয়ে বসেছিলেন মহানায়ক, যা দেখে মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন খোদ সৌমিত্রও!
ঘটনাটি দক্ষিণ কলকাতার ম্যান্ডিভিলা গার্ডেনসের। মহানায়ক উত্তম কুমারের ছেলে গৌতমের বিয়ের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান বসেছিল সেখানে। টলিউডের দিকপাল তারকাদের উপস্থিতিতে চাঁদের হাটে পরিণত হয়েছিল পুরো প্রাঙ্গণ। সেই আনন্দঘন সন্ধ্যায় আমন্ত্রিত হয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন উত্তমের স্নেহের পুলু অর্থাৎ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।
অনুষ্ঠানে পৌঁছে অতিথিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় সেরে সৌমিত্র যখন রাতের খাবার খাওয়ার দিকে পা বাড়াচ্ছেন, ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে আসে মহানায়কের কড়া গলা— “পুলু! ওদিকে যাস না একদম!” ভরা বিয়েবাড়িতে আচমকা উত্তমের এমন চিৎকার শুনে বেশ চমকে যান সৌমিত্র। ততক্ষণে মহানায়ক নিজে হেঁটে এগিয়ে এসেছেন তাঁর দিকে। গম্ভীর মুখে বলে উঠলেন, “তুই আজ খাবি না! এখানকার খাবার তোকে আমি কিছুতেই খেতে দেব না।”
মহানায়কের মুখে এমন অপ্রত্যাশিত কথা শুনে রীতিমতো হতবাক হয়ে যান সৌমিত্র। পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে নিঃশব্দে খাবারের টেবিল থেকে পিছিয়ে আসেন। সৌমিত্রর বিভ্রান্ত মুখ দেখে ঠিক পরক্ষণেই আসল কারণটা খোলসা করেন উত্তম। ভালোবেসে বকে উঠে বলেন, “তোর তো গ্যাস্ট্রিকের মারাত্মক সমস্যা! এই বিয়েবাড়ির তেল-মশলাদার খাবার খেলে শরীর খারাপ হতে বাধ্য। তাই এসব তোকে ছুঁতেও দেব না।”
শুধু বারণ করেই ক্ষান্ত হননি মহানায়ক। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রী গৌরীদেবীকে ডেকে সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দেন, “পুলুর জন্য আলাদা করে দই আর মিষ্টি নিয়ে এসো তো! ও আজ এসব হালকা খাবারই খাবে।”
নিজের ছেলের বিয়ের মতো এক পরম ব্যস্ততার মাঝেও উত্তম কুমার যে তাঁর শারীরিক অসুস্থতার কথা ভুল যাননি এবং বড় ভাইয়ের মতো নজর রেখেছেন, মহানায়কের এই রূপ দেখে সেদিন শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন সৌমিত্র। অনুরাগীরা রুপোলি পর্দায় তাঁদের যতই প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবুন না কেন, জীবনের ক্যানভাসে উত্তম-সৌমিত্রর বন্ধন ছিল ঠিক এমনই নিখাদ ও অমলিন।
তথ্যসূত্র- আমার দাদা উত্তম, তরুণ কুমার