
টলিউডে নেমে এল গভীর শোকের ছায়া। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর এসএসকেএম হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন বর্ষীয়ান পরিচালক রাজা সেন। তাঁর মৃত্যুতে টলিপাড়ায় একটা যুগের অবসান হল। শোকস্তব্ধ গোটা বিনোদন জগৎ। এই মন খারাপের দিনে পরিচালকের সঙ্গে কাটানো পুরনো স্মৃতি হাতড়ে শোকপ্রকাশ করেছেন অভিনেতা চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী।
দীর্ঘদিনের আলাপ তাঁদের। কাজও করেছেন একসঙ্গে। টিভি৯ বাংলা কে চিরঞ্জিৎ বলেন, “রাজা সেনের সঙ্গে আমার আলাপ বহু বছরের। ও ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড উইনার। বড় দুর্ভাগ্যের কথা যে রাজা চলে গেল।” পরিচালকের মৃত্যুতে মর্মাহত অভিনেতা আরও বলেন, “রাজাকে হারানো মানে এটা ইন্ডাস্ট্রির খুব বড় ক্ষতি হল, আমার নিজের পার্সোনালি ক্ষতি হল খুব।”
রাজা সেনের পরিচালনায় বেশ কিছু কাজ করেছিলেন তিনি। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চিরঞ্জিৎ বলেন, “ওর সঙ্গে একটা ছবি করেছিলাম, সেখানে ইন্দ্রজিৎ নামে এক নতুন ছেলে এসেছিল। বম্বের শ্রীবাস্তব ভিলেনের চরিত্র করেছিল আর আমি একটা নেগেটিভ রোল করেছিলাম। দারুণ ভালো কাজ হয়েছিল।” এছাড়াও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘মুশকিল আসান’ প্রোজেক্টে কাজ করার কথা মনে করিয়ে দেন তিনি। চিরঞ্জিতের কথায়, “শিবুদের জন্য যখন মুশকিল আসান করছিলাম, তখন অনেকগুলো গল্পের ডিরেকশন ও দিয়েছিল।” আক্ষেপের সুরে তিনি আরও জানান, “রোজভ্যালির একটা প্রোডাকশন ছিল। তাতে তাপসও ছিল, তাপসের মেয়েও ছিল। কিন্তু রিলিজের মুখে সেই ছবি আটকে যায় আর মুক্তি পায়নি।”
কাজের বাইরেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গা থেকে নিবিড় যোগ ছিল তাঁদের। চিরঞ্জিৎ জানান, “ওর বউ হচ্ছে বেনুর (শুভাশিস মুখোপাধ্যায়) বোন। খুব চমৎকার মেয়ে। ও তো সারভাইভ করল, মাঝখানে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।” দীর্ঘ শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে রাজা সেনের লড়াইয়ের কথাও উল্লেখ করেন অভিনেতা। তিনি বলেন, “শরীরটা ওর অনেকদিনই ভালো ছিল না। আমি জিজ্ঞেস করতাম যে কিরে কেমন আছে, শরীর কেমন আছে? ও বলত, হ্যাঁ শরীর ঠিক আছে।”
আর্থিক সাফল্যের চেয়েও শিল্পীর সত্তা আর ভালো মনটাই ছিল তাঁর বড় পরিচয়। চিরঞ্জিত তাই ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, “বড় প্রিয় মানুষ, ভালো মনের মানুষ ছিল। ফিনান্সিয়ালি হয়তো খুব সাকসেসফুল কেরিয়ার নয়, কিন্তু নামী একজন ডিরেক্টর।” তাঁর চলে যাওয়া বাংলা সিনেমার জন্য এক বিরাট শূন্যতা তৈরি করল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
পরিচালকের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। সোশাল মিডিয়ায় তিনি লিখেছেন, ‘একজন কিংবদন্তির বিদায় সবসময়ই বেদনাদায়ক। বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান আমাদের কাছে অমূল্য। রাজাদা, আপনাকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। আপনার সৃষ্টি ও স্মৃতি চিরকাল থেকে যাবে।’
পরিচালকের এই দীর্ঘ শারীরিক লড়াইয়ের সূত্রপাত ঘটেছিল বেশ কয়েক বছর আগে। ‘মায়া মৃদঙ্গ’ ছবির শুটিং চলার সময়ে আচমকাই সেট থেকে পড়ে গিয়ে কোমরে মারাত্মক চোট পান তিনি। সেই সময়ে আঘাতটি বিশেষ গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু পরবর্তীতে তার চরম মাশুল গুনতে শুরু করেন বর্ষীয়ান পরিচালক। গত ছয়-সাত বছর ধরে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে গিয়েও তীব্র কষ্টে পড়তে হত তাঁকে। এরপর চলতি বছরের গোড়াতেই হঠাৎ করে তাঁর শরীরের নিম্নাংশ অবশ হয়ে যেতে শুরু করে। তড়িঘড়ি চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে যাওয়া হলে ধরা পড়ে জটিল স্নায়ুর সমস্যা। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁর কোমর ও মেরুদণ্ডের মাঝের অংশে একটি বড় অস্ত্রোপচার করা হয়। কিছুদিনের জন্য সুস্থতার আলো দেখা গেলেও, ফের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। শেষমেশ পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করলে তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাখা হয়েছিল ভেন্টিলেশনে। কিন্তু চিকিৎসকদের সব আপ্রাণ চেষ্টা ব্যর্থ করে চিরঘুমের দেশে পাড়ি দিলেন তিনি।