
বলিউড বা ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের কথা উঠলে, যাঁর নাম সবার প্রথমে উঠে আসে, তিনি হলেন ‘সুপারস্টার’ রাজেশ খান্না (Rajesh Khanna)। কেরিয়ারের একদম শুরুর দিকে পর পর কয়েকটি ছবি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়লেও, পরিচালক শক্তি সামন্তের ‘আরাধনা’ ছবিতে কাকা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে রাজত্ব করতেই এসেছেন। এই ছবির ব্লকবাস্টার সাফল্যের পর আর কখনও পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। এরপর একে একে ‘সফর’, ‘আনন্দ’, ‘আন্দাজ’, ‘অমর প্রেম’-এর মতো একের পর এক সুপারহিট ছবি উপহার দিয়ে সাফল্যের এভারেস্টে চড়েছিলেন তিনি। তবে জীবনের মধ্যগগনে যিনি এমন আকাশছোঁয়া সাফল্য উপভোগ করেছিলেন, সেই রাজেশ খান্নার শেষ জীবনটা ছিল চরম মর্মান্তিক ও যন্ত্রণাদায়ক। বিছানায় শুয়ে তাঁর একেকটা দিন যেন একেকটা বছরের মতো কাটত।
বলিপাড়ার অন্দরে কান পাতলে শোনা যায়, রাজেশের এই পরিণতির জন্য অনেকাংশে দায়ী ছিলেন তিনি নিজেই। লাগামহীন জীবনযাপন, মাত্রাতিরিক্ত অহংবোধ এবং খামখেয়ালিপনাই তাঁর জীবনের চোরাবালি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা তাঁকে পতনের দিকে ঠেলে দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অভিনেত্রী ডিম্পল কাপাডিয়ার সঙ্গে তাঁর তিক্ত দাম্পত্য কলহ। তবে বৈবাহিক জীবনের টানাপোড়েনের মাঝে রাজেশের জীবনে এসেছিলেন অনিতা আডবাণী। জানা যায়, সুপারস্টারের জীবনের সেই পড়ন্ত আলোয় অনিতাই ছিলেন তাঁর একমাত্র ছায়াসঙ্গী।
সম্প্রতি ‘অবন্তি ফিল্মস’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অনিতা আডবাণী মেলে ধরেছেন রাজেশ খান্নার জীবনের শেষ দিনগুলোর সেই করুণ কাহিনি। অনিতা জানান, “রাজেশের একটা তীব্র ইচ্ছে ছিল যে ওঁর মৃত্যুর পর ওঁর সাধের বাড়িটি যেন একটি মিউজিয়াম বা সংগ্রহশালা করা হয়। ওঁর সুপারস্টার হয়ে ওঠার গৌরবময় ইতিহাসটা যেন সেখানে সবসময় জীবন্ত থাকে। কিন্তু ওঁর অসুস্থতার মাঝেই আচমকা বাড়িটি ১৫০ কোটি টাকায় কিনে নেওয়ার একটি প্রস্তাব আসে। এই ঘটনায় মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েছিলেন রাজেশ। তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে সেই ক্রেতাকে পত্রপাঠ বিদায় করে দেন।”
অনিতা আরও জানান, শেষ সময়ে রাজেশের সেই কষ্ট চোখের সামনে দেখা যেত না। বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে রাজেশ বারবার বলতেন, “আমি নিজের এই অবস্থা আর সহ্য করতে পারছি না। এর চাইতে ঈশ্বর আমাকে মেরে ফেলুক।”
অনিতার কথায়, “আমি ওঁর সামনে বসে ওঁর হাত ধরে কত বোঝাতাম, ইতিবাচক নানা কথা বলতাম যাতে উনি মনের জোর পান। সেই সময় ডিম্পলও ওঁর দুই মেয়েকে (টুইঙ্কল ও রিঙ্কি) নিয়ে মাঝে মাঝে দেখা করতে আসতেন। কিন্তু রাজেশের মুখে তখন শুধুই অবসাদের সুর। শেষ পর্যন্ত ওনাকে আর ধরে রাখা গেল না।” ওঁর প্রয়াণের পর রাজেশের সেই ঐতিহাসিক বাংলো ‘আশীর্বাদ’ যখন ভেঙে ফেলা হয়, সেই দৃশ্য মেনে নিতে পারেননি অনিতাও। কোটি কোটি ভক্তের হৃদয়ে রাজত্ব করা এক চিরসবুজ নায়কের জীবনের অন্তিম অধ্যায় যে কতটা নিঃসঙ্গ আর বেদনার হতে পারে, অনিতার এই স্মৃতিচারণায় যেন আরও একবার সেই রূঢ় সত্যটাই সামনে এল।