
কেরল: ব্যবসা করার স্বপ্ন বা শখ অনেকের থাকে, কিন্তু সে স্বপ্ন সাকার করার জন্য দরকার অদম্য ইচ্ছা। জীবন সবসময় সহজ নয়। বাধার পর বাধা কাটিয়ে কীভাবে লক্ষ্যে স্থির থাকতে হয়, কীভাবে মাথা উঁচু রেখে সব ঝড়-ঝাপটা সামলাতে হয়, সেটাই কার্যত দেখিয়ে দিয়েছেন রাজমোহন পিল্লাই। কার্যত সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো রাজমোহনের জীবনে খুব কম বয়সেই নেমে এসেছিল দুঃস্বপ্নের রাত। বিলাসে জীবন কাটানোর বদলে মাথার ছাদটুকু বাঁচাতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছিল তাঁকে। আজ তাঁর সংস্থার টার্নওভার ২০০ কোটি।
‘বেটা গ্রুপে’র কর্ণধার রাজমোহন পিল্লাই কার্যত এক নজির তৈরি করেছেন তাঁর কেরিয়ারে। পরিবারের বিপুল ঋণের বোঝা সামলে একটু একটু করে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন নিজের সংস্থাকে। তাঁর পারিবারিক ব্যবসা আজ ২০০ কোটির টার্নওভারের সাক্ষী।
বেটা গ্রুপের চেয়ারম্যান রাজমোহন পিল্লাই। মূলত কাজু প্রসেসিং ও অন্যান্য বাদামের ব্যবসায় রয়েছে এই সংস্থার। বিদেশে রফতানি করে থাকে এই বেটা গ্রুপ। তবে আজ যে সংস্থা এই বিপুল লাভের মুখ দেখছে, এমনটা চিরকাল ছিল না। বিশেষত রাজমোহন যখন মাত্র ১৮ বছর বয়সে বাধ্য হয়ে পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরেন, তখন তাঁর কাঁধে ছিল বিপুল ঋণের বোঝা। সে সব সামলে তিনি যেভাবে ধুরে দাঁড়িয়েছেন, তা এক দৃষ্টান্ত।
If
Behind every successful man, there’s a womanWhat’s behind unsuccessful men?🙄
I wonder 🤔 pic.twitter.com/uwJUWBkBfG
— Rajmohan Pillai (@rajmohanpillai) October 16, 2023
এক সাক্ষাৎকারে বাল্যবেলার কথা বলতে গিয়ে রাজমোহন বলেন, একটা সময় ছুটি মানেই সংস্থার ফ্যাক্টরিতে ঘুরতে যেতেন তাঁরা। সেখানেই থাকতেন, খেতেন। দক্ষিণ ভারতের অন্যতম ধনী ব্যক্তির ছেলে ছিলেন তিনি। তাঁদের ফ্ল্যাট ভাড়ায় নিয়ে থাকতেন বিজয় মালিয়া। বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, বাড়ি দেখে ১৩-১৪ বছর বয়সে তিনি ভাবতেন, এভাবেই বোধহয় জীবনটা উপভোগ করে কাটিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু জীবনটা অন্যদিকে মোড় নেয় ১৮ বছর বয়সে।
বাবার হার্ট অ্যাটাক। এই একটা ঘটনা রাজমোহনের জীবনটা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তাঁর বাবার যেখানে একসময় ১৬ কোটি টাকা এফডি ছিল, সেখানে রাজমোহন হঠাৎ জানতে পারবেন তাঁর বাবার কাঁধে ৪০ কোটির ঋণ। লোকে ভাবত, কিছুই বদলায়নি। গাড়ি আছে, বাড়ি আছে। কেউ কেউ বলতেন, গাড়ি বিক্রি করে টাকা মেটাচ্ছেন না কেন রাজমোহন? কিন্তু কেউ জানতেন না গাড়িটা আদতে ব্যাঙ্ক বাজেয়াপ্ত করে রেখেছে। বাড়িটাও তাই। শূন্য নয়, মাইনাস থেকে শুরু করার লড়াই শুরু করেন তিনি।
বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ার পর বি কম প্রথম বর্ষের ছাত্র রাজমোহনকে একরকম বাধ্য হয়েই ব্যবসার হাল ধরতে হয়। সেই সময় তাঁর পরিবারের সম্পত্তির পরিমাণ ছিল ৩ কোটি টাকা আর ঋণের বোঝা ছিল ৪০ কোটির। সংস্থার মাথার উপর ছিল ১৭৫টি মামলা। তাঁদেক সম্পত্তি, এমনকী গাড়িও বাজেয়াপ্ত হয়ে যায় সেই সময়। সংস্থার কর্মীদের বেতন দেওয়াই ছিল রাজমোহনের কাছে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।
Good work and selfless love will help you to tread the path of success and happiness. – #rajmohanpillai pic.twitter.com/yBRZSSKnrf
— Rajmohan Pillai (@rajmohanpillai) October 1, 2023
যখন ঋণ বা ব্যাঙ্ক ব্যালান্সের অঙ্ক সেভাবে বুঝে উঠতে পারেননি, তখনই মাসে মাসে ৪৪ লক্ষ টাকা করে শুধুমাত্র সুদ দিতে হয়েছে তাঁকে। তবে কখনও হাল ছেড়ে দেননি তিনি। এক-দুই বছর নয়, ২৭ বছর ধরে ঋণ মেটাতে হয়েছে তাঁকে।
ব্যবসা বাড়ানো নয়, পরিবার ও সংস্থাকে ঋণ-মুক্ত করাই একটা সময় ছিল চ্যালেঞ্জ। রাজমোহন তাঁর সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তাঁর মা কখনই সমস্যা থেকে পালিয়ে যাওয়া বা মুখ ঘুরিয়ে থাকা পছন্দ করতেন না। সেই আদর্শেই এগিয়েছেন রাজমোহনও। তিনি মনে করেন, সাফল্য আসুক বা না আসুক, কেউ যদি প্রতিদিন নিষ্ঠাভরে নিজের কাজটা করে যায়, তাহলে একটা সময় ফল আসবেই। এভাবেই আত্মবিশ্বাস বেড়েছে তাঁর। লাভের অঙ্কও বেড়েছে একটু একটু করে।
তিনি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, “সব যখন ঠিক হয়ে গেল, তখন সবাই সব ভুলে গেল। ব্যাঙ্কও আবার ঋণ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। কর্মীরা খুশি হয়ে কাজ করতে শুরু করলেন।” তবে সেই ভালো সময়টা আর দেখে যেতে পারেননি রাজমোহনের বাবা। তার আগেই মৃত্যু হয় তাঁর।
তবে এই এগিয়ে চলার পথে রাজমোহন বারবার বলেছেন, তাঁর মায়ের অবদানের কথা। শিশু বয়সে ডিসলেক্সিয়ায় ভোগা রাজমোহনের লড়াইতে বরাবর পাশে থেকেছেন তিনি। বিশেষত দাদার মৃত্যুর পর দায়িত্ব দ্বিগুণ হয়ে যায় রাজমোহনের। সবদিক সামলে তিনি তৈরি করেন বেটা গ্রুপ। আজ তারই লাভের অঙ্ক বছরে ২০০ কোটি ডলার।
শুধুমাত্র ব্যবসাই নয়, পাশাপাশি বইও লেখেন রাজমোহন পিল্লাই। ছেলেবেলা থেকেই বই পড়তে পছন্দ করতেন তিনি। তাঁর কথায়, “আমার এত কথা বলার আছে, এত অনুভূতি প্রকাশ করার আছে, যেটা বই না লিখলে প্রকাশ করতে পারতাম না।” বিশেষত দাদার মৃত্যুর পর তাঁর মনে এত স্মৃতি ভিড় করতে থাকে, সেটাই তিনি বইতে লেখেন। তিনি মনে করেন, গল্প বলাই অনুভূতি প্রকাশ করার শ্রেষ্ঠ উপায়।