
নয়াদিল্লি: স্বামীর মৃত্যুর দিন থেকেই বিধবার পারিবারিক পেনশন পাওয়ার অধিকার তৈরি হয়। তিনি কবে সেন্ট্রাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনাল (CAT)-র দ্বারস্থ হয়েছেন, তার ভিত্তিতে সেই পেনশন পাওয়ার সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে, পেনশন দাবি করতে দেরি করার জন্য যদি বিধবার কোনও দোষ না থাকে, তাহলে স্বামীর মৃত্যুর তারিখ থেকেই তাঁকে পারিবারিক পেনশন দিতে হবে। এক বিধবার পারিবারিক পেনশন মামলায় এই গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট।
বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র এবং বিচারপতি শ্রী চন্দ্রশেখরের বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। মামলাটি করেছিলেন মৃত এক রেলকর্মীর স্ত্রী। ওই রেলকর্মী ২০০০ সালে কর্মরত অবস্থাতেই মারা যান। বম্বে হাইকোর্ট তাঁর পারিবারিক পেনশনের দাবি মেনে নিলেও ২০০০ সালের পরিবর্তে ২০১৪ সাল থেকে পেনশন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। কারণ, ২০১৪ সালেই প্রথম CAT-এর দ্বারস্থ হয়েছিলেন ওই মহিলা। হাইকোর্টের সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করেই সুপ্রিম কোর্টে যান তিনি।
জানা যায়, দাম্পত্য বিবাদের কারণে স্বামী ও স্ত্রী আলাদা থাকতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর চাকরি এবং পরিষেবা সংক্রান্ত তথ্যও তাঁর জানা ছিল না। এরপর ২০০১ সালে, অর্থাৎ মৃত্যুর পর ওই রেলকর্মীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। সেই বরখাস্তের বিরুদ্ধে বিধবা আবেদন করলেও ২০১২ সালে তা খারিজ হয়ে যায়। আবেদনে দেরি এবং স্বামীর মৃত্যুর তারিখ নিয়ে নথিতে অসঙ্গতি থাকার কারণ দেখানো হয়েছিল।
এরপর স্বামীর মৃত্যুর সঠিক তারিখ নির্ধারণের জন্য দেওয়ানি আদালতের দ্বারস্থ হন ওই মহিলা। আদালত ১২ নভেম্বর ২০০০-কে তাঁর স্বামীর মৃত্যুর সঠিক তারিখ হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর তিনি CAT-র কাছে পারিবারিক পেনশনের দাবি জানান। কিন্তু CAT তাঁর আবেদন সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার কারণে খারিজ করে দেয়। পরে বম্বে হাইকোর্টে যান তিনি। হাইকোর্ট পেনশন দেওয়ার নির্দেশ দিলেও তা ২০১৪ সাল থেকে কার্যকর করার কথা বলে।
এরপর সুপ্রিম কোর্টে ওই বিধবা দাবি করেন, স্বামীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর পারিবারিক পেনশন পাওয়ার অধিকার। তাই পরবর্তীকালে তিনি কবে আদালত বা ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হয়েছেন, সেই কারণে তাঁর প্রাপ্য পেনশন কমিয়ে দেওয়া যায় না।
অন্যদিকে কেন্দ্রের তরফে একটি মামলার রায়ের উল্লেখ করে বলা হয়, পুনরাবৃত্ত ধরনের অন্যায়ের ক্ষেত্রে সাধারণত আদালতে মামলা দায়েরের আগের তিন বছরের বেশি সময়ের বকেয়া পাওনা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় না। সেই নীতির ভিত্তিতেই হাইকোর্ট ২০১৪ সাল থেকে পেনশন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল বলে কেন্দ্রের দাবি।
তখন সুপ্রিম কোর্ট অন্য একটি মামলার রায় উল্লেখ করে জানায়, বিধবাকে আদালতে গিয়ে পেনশন দাবি করতে বাধ্য করা নিয়োগকর্তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। বরং নিয়োগকর্তারই দায়িত্ব হল, স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবার প্রাপ্য পারিবারিক পেনশন হিসাব করে তা তাঁকে প্রদান করা। পেনশন না দেওয়া সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত অধিকারের লঙ্ঘন বলেও পর্যবেক্ষণ করে শীর্ষ আদালত।
সুপ্রিম কোর্ট আরও স্পষ্ট করে জানায়, পেনশন কোনও দয়া বা অনুদান নয়, এটি একজনের গুরুত্বপূর্ণ অধিকার এবং সম্পত্তির অংশ। ফলে ২০১৪ সাল থেকে পেনশন দেওয়ার সিদ্ধান্ত ওই বিধবার প্রতি চরম অন্যায় হবে। বিশেষ করে যখন পেনশন পেতে দেরি হওয়ার জন্য তাঁর কোনও দোষ ছিল না এবং স্বামীর মৃত্যুর তারিখ নিয়ে তৈরি হওয়া জটিলতা মেটাতেও তাঁকেই দেওয়ানি আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল।
আদালত আরও উল্লেখ করে, স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করাও রেল বোর্ডের নিজস্ব সার্কুলার অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য ছিল না। পরবর্তীতে পারিবারিক পেনশনের জন্য ওই মহিলার আবেদনও স্বামীর মৃত্যুর তারিখ নিয়ে অসঙ্গতির অজুহাতে খারিজ করা হয়। অথচ তাঁর কাছে ইতিমধ্যেই বৈধ মৃত্যুশংসাপত্র ছিল। ফলে পেনশন পেতে দেরি হওয়ার জন্য ওই বিধবাকে কোনওভাবেই দায়ী করা যায় না।
শেষ পর্যন্ত বিধবার আবেদন মঞ্জুর করে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে, তাঁকে তাঁর স্বামীর মৃত্যুর তারিখ, অর্থাৎ ১২ নভেম্বর ২০০০ সাল থেকেই পারিবারিক পেনশন দিতে হবে। পাশাপাশি বকেয়া পেনশনের উপর বার্ষিক ৬ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। তিন মাসের মধ্যে যাবতীয় পাওনা মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত।