
ভারতীয় বায়ুসেনার সবচেয়ে বড় শক্তির নাম এখন রাফাল যুদ্ধবিমান। রাতের অন্ধকারকে চিরে সেই রাফাল-ই সদ্য অস্ট্রেলিয়ার আকাশে নিজের দম দেখাল। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও নামী মাল্টি ন্যাশনাল এয়ার কমব্যাট মহড়ায় এই প্রথম খেল দেখাল রাফাল। প্রমাণ করে দিল, আগামী দিনে এয়ার টু এয়ার কমব্যাটে কেন ভারতীয় সেনার রাফাল-কে, গেম চেঞ্জার বলা হয়?
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস গড়ল ভারতীয় বায়ুসেনা। অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত Exercise Pitch Black 26-এ আত্মপ্রকাশ করল ভারতীয় বায়ুসেনার রাফাল ফাইটার জেট। আর এর সঙ্গেই দূরপাল্লার আকাশ যুদ্ধে নিজেদের আধিপত্য প্রমাণ করল ভারত। রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্স আয়োজিত এই মহড়ায় ২১ দেশের ১০০টিরও বেশি এয়ারক্রাফট ও প্রায় আড়াই হাজার সেনা অংশ নেয়। ভারত প্রথমবার এই মহড়ায় রাফাল যুদ্ধবিমান পাঠায়। সঙ্গে সি-১৭ গ্লোবমাস্টার ও গ্ৰুপ ক্যাপ্টেন অরুণ কুমারের নেতৃত্বে ১২০ জন এয়ার ওয়ারিয়র। তিন সপ্তাহের এই মহড়ায় শূন্য দৃশ্যমানতা, মাটির খুব কাছাকাছি ওড়া বা যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে পরীক্ষা করে দেখে নেওয়া হয় রাফালের লড়াই করার দক্ষতা। সবক্ষেত্রেই লেটার মার্ক্স্ নিয়ে পাশ করেছে রাফাল।
অস্ট্রেলিয়ার আকাশে রাফালের খেল। এই মহড়ায় রাফাল কী করল?
জানেন কি, কেন অস্ট্রেলিয়াতে সেনার রাফালের এই পারফরম্যান্স গুরুত্বপূর্ণ?
আসলে এই মহড়ায় রাফাল নিজের চেনা মাঠের বাইরে এত বড় পরীক্ষা দিল। ভারতের রাফাল সাধারণত আমাদের দেশের চেনা পরিবেশেই অপারেট করে। কিন্তু ভারত মহাসাগর পেরিয়ে সুদূর অস্ট্রেলিয়াতে রাফালে নিয়ে গিয়ে সেখানে অন্য দেশগুলির ফাইটার জেটের সঙ্গে মহড়া দেওয়া, বায়ুসেনার দূরপাল্লায় যুদ্ধের ক্ষমতার প্রদর্শন। এটাকে ভারতীয় টিমের ওভারসিজ পারফরম্যান্সের মতো করে ভাবুন। দেশের মাটিতে টিম যতই ভাল খেলুক না কেন, বিদেশের মাটিতে কেমন পারফর্ম করে, তার উপরে নির্ভর করে টিমের আসলে কতটা শক্তিশালী। সব আবহাওয়া, পিচে, সুইংয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে কি না।
কোনও দেশের বায়ুশক্তিকে শুধু সে দেশের হাতে থাকা বিমান দিয়ে মাপা যায় না। মাপতে হয়, ফাইটার জেটকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়ে জ্বালানি, রক্ষনাবেক্ষন, লজিস্টিক, পাইলট ও অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহারের দক্ষতা দিয়ে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অস্ট্রেলিয়াতে অন্য দেশের ফাইটার জেটের সঙ্গে যৌথ মহড়া। পিচ ব্ল্যাক মহড়ায় অস্ট্রেলিয়া, জাপান, জার্মানি, কোরিয়ার মতো দেশের ফাইটার জেটের সঙ্গে টক্কর দিল ভারতের রাফাল। অন্য দেশের aircraft-এর সঙ্গে জটিল যুদ্ধ মহড়ায় অংশগ্রহণ ভারতীয় বায়ুসেনার জন্য বড় প্রাপ্তি তো বটেই।
পাশাপাশি এই মহড়ার কূটনৈতিক প্রভাবও দীর্ঘমেয়াদী। ইন্দো-প্যাসিফিক এলাকায় ভারত নিজের মিলিটারি প্রেজেন্স বাড়াচ্ছে। ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নিজেদের ডিফেন্স পার্টনারশিপ বাড়াচ্ছে। Australian Air Force-এর tanker KC-30A-এর সঙ্গে ভারতীয় Rafale, মাঝ আকাশে জ্বালানি ভরা অভ্যাস করছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের যুদ্ধবিমান একে অপরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার পারদর্শিতার প্রমাণ দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে ও দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে combat operation করার দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এই মহড়ায় তো একা রাফাল ছিল না। জাপানের F-35-সহ অত্যাধুনিক ফাইটার জেট–ও ছিল। অর্থাৎ ভারতের রাফাল এমন সব এয়ারক্রাফটের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নিল যেগুলি বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ফাইটার প্ল্যাটফর্মের মধ্যে পড়ে।
ভারতীয় বায়ুসেনা যে ভিডিও প্রকাশ করেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, Darwin-এর বিখ্যাত Mindil Beach-এর উপর দিয়ে রাফাল ফ্লাই পাস্ট করছে। মহড়ার পাশাপাশি সেটা এক জোরাল স্ট্র্যাটেজিক বার্তাও। অর্থাৎ বিশ্বকে জানানো, ভারতের হাতে আজ শুধু অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান-ই নেই, বরং ক্ষমতা রয়েছে, দেশীয় ঘাঁটি থেকে বহু দূরে তাকে নিয়ে গিয়ে যুদ্ধ পরিচালনার। এককথায় বললে, অস্ট্রেলিয়াতে রাফালের পারফরম্যান্স নিজেদের শক্তি দেখানোর চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিল। এই মহড়ায় রাফালের কেরামতি ভারতের দূরপাল্লায় লড়াই করার ক্ষমতা, অন্য দেশের সঙ্গে সহযোগিতা করে যুদ্ধে অংশগ্রহণের দক্ষতা ও ইন্দো-প্যাসিফিক এলাকায় মিত্র দেশগুলির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বড় বার্তা। দ্রুতই ৩.২৫ লক্ষ কোটি টাকার চুক্তি মোতাবেক ফ্রান্স থেকে ১১৪টি নতুন রাফাল পাবে ভারত। যার মধ্যে ৯৪টি তৈরি হবে এদেশেই।