
আহমেদাবাদ: অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি! জলবায়ু পরিবর্তনের যে কুফল মানুষ ইদানীং প্রায়ই চাক্ষুষ করছে, তার সাম্প্রতিকতম ‘শিকার’ গুজরাট (Gujarat)। ‘ব্যতিক্রমী ভারী বৃষ্টি’র সাক্ষী মোদী-রাজ্যের ভালসাদ (Valsad) জেলার উম্বেরগাঁও। একদিনে ১০৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টি! ২ মাসের বৃষ্টি ঝরেছে মাত্র ২৪ ঘণ্টায়।
গত সোমবার কয়েক ঘণ্টায় ১৬৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল দমদমে। তাতেই ডুবে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। দমদমের সাড়ে ৬ গুণ বৃষ্টি উম্বেরগাঁওয়ে। ফল মারাত্মক। আস্ত গাড়ি ডুবেছে। নদীর চেহারা নিয়েছে রাস্তা, চলছে স্পিডবোট। দামি অ্যাপার্টমেন্টের পরিপাটি করে সাজানো একতলা ভাসছে। জলের নীচে বেডরুম, ডাইনিং রুম।
সমুদ্রপাড়ের উম্বেরগাঁও যেন পাহাড়ি চেরাপুঞ্জির সঙ্গে সরাসরি টক্করে। দেশের দৈনিক বৃষ্টির রেকর্ড-খাতায় চেরাপুঞ্জিরই রমরমা। শীর্ষে চেরাপুঞ্জি, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম… সব রেকর্ডই চেরাপুঞ্জির দখলে ছিল। বৃহস্পতিবার তৃতীয় স্থানের তকমায় চেরাপুঞ্জির ১৯৭৪ সালের রেকর্ডটিকে সরিয়ে উঠে এল ভালসাদের উম্বেরগাঁও। ভেঙে গেল ২০০৫ সালের ‘কুখ্যাত’ মুম্বই বন্যার রেকর্ডও। ২৭ জুলাই মুম্বইয়ে সান্তাক্রুজে বৃষ্টি হয়েছিল ৯৪৪.২ মিলিমিটার। তবে শীর্ষে এখনও চেরাপুঞ্জি। মৌসম ভবনের তথ্য বলছে, ১৯৯৫ সালের ১৬ জুন ১,৫৬৩.৩ মিলিমিটার বৃষ্টি ঝরেছিল চেরাপুঞ্জিতে। দ্বিতীয় লাক্ষাদ্বীপের আমিনিদিভি, ২০০৪ সালের ৬ মে ১,১৬৮ মিলিমিটার বৃষ্টি ঝরে। নেপথ্যে ছিল আরব সাগরের শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। তার পর এই প্রথম একদিনে হাজার মিলিমিটার বা তার বেশি বৃষ্টি হল দেশে। যা ভারী বা অতি ভারী বা চরম ভারী নয়, ‘ব্যতিক্রমী ভারী বৃষ্টি’র তকমা দিচ্ছে মৌসম ভবন।
‘ব্যতিক্রমী ভারী বৃষ্টি’র অর্থ, একদিনে ৩০০ মিলিমিটার বা বেশি বৃষ্টি। শুধু উম্বেরগাঁও নয়, ভালসাদের একাধিক জায়গায় ব্যতিক্রমী ভারী বৃষ্টি হয়েছে। যেমন, কাপরাদা, ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টির পরিমাণ ৭৯৪ মিলিমিটার। দু’দিন মিলিয়ে এই গুজরাতি জনপদে বৃষ্টি হয়েছে ১,২১২ মিলিমিটার। বস্তুত গুজরাট, দাদরা নগর হাভেলি, দমন-দিউ, লাগোয়া মহারাষ্ট্রে গত ৩-৪ দিন ধরে প্রবল বৃষ্টি চলছে। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ তল্লাটে লাল সতর্কতা।
মৌসম ভবনের বিশ্লেষণ বলছে, একাধিক ‘অনুঘটক’ বর্ষাকে অতিসক্রিয় করে রেখেছে। প্রথমত, রাজস্থান ও লাগোয়া মধ্য প্রদেশের উপর ঘূর্ণাবর্ত। দ্বিতীয়ত, স্বাভাবিকের অনেকটা দক্ষিণে, রাজস্থান হয়ে মৌসুমি অক্ষরেখার বিস্তৃতি। তৃতীয়ত, জম্মু ও লাগোয়া অঞ্চলে থাকা পশ্চিমী ঝঞ্ঝা। মৌসুমি বাতাসের প্রবাহ ও পশ্চিমী ঝঞ্ঝার ‘জোট’-এর ভূমিকাও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অথচ যে রাজ্যে এত বৃষ্টি হল, সেই গুজরাটে এখনও ২০ শতাংশ বৃষ্টি-ঘাটতি। সৌরাষ্ট্র-কচ্ছে ঘাটতি ৪২ শতাংশ। অর্থাত্, রাজ্যের মধ্যেই চূড়ান্ত খামখেয়ালিপনা বর্ষার। ১ জুন থেকে এ পর্যন্ত ভালসাদে ৯৫ শতাংশ অতিবৃষ্টি। ঠিক উল্টো ছবি দ্বারকায়, ঘাটতি ৯৫ শতাংশ। কচ্ছে ঘাটতি ৮৬ শতাংশ, বনসকণ্ঠে ঘাটতি ৬৭ শতাংশ। কেউ খরায় ভুগছে, কেউ বন্যায় যুঝছে। আবহবিদরা বলছেন, এরই নাম এক্সট্রিম ওয়েদার (Extreme Weather)। জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কুফল, যার ধাক্কা শুধু গুজরাট নয়, দেশের কোনায় কোনায়।