
নয়াদিল্লি: গত কয়েক সপ্তাহে দেশে চিনির দাম বেড়েছে। গত ২০ জুলাই প্রতি কেজি চিনির দাম ছিল ৪৮.১৮ টাকা। যা ২০ অগস্টে বেড়ে হয়েছে ৫৫.৭০ টাকা। পরিস্থিতির উপর কেন্দ্রীয় সরকার কড়া নজর রাখছে। উৎসবের মরশুমে সাধারণ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত চিনি সরবরাহ এবং দাম স্থিতিশীল রাখতে একাধিক পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্র।
চিনির দাম বৃদ্ধির জন্য ইথানল উৎপাদন দায়ী নয়-
কেন্দ্র স্পষ্ট করে দিয়েছে, ইথানল উৎপাদনের জন্য চিনির সাম্প্রতিক দাম বৃদ্ধিকে দায়ী করা ঠিক নয়। বরং ২০২২-২৩ সালে ইথানল উৎপাদনের জন্য মোট চিনির প্রায় ১২ শতাংশ ব্যবহার করা হলেও ২০২৫-২৬ সালে সেই হার কমে প্রায় ৯ শতাংশ হয়েছে। বর্তমানে দেশে উৎপাদিত ইথানলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই আসে শস্য, বিশেষ করে ভুট্টা থেকে।
চিনির দাম বৃদ্ধির কারণ-
চিনির দাম বৃদ্ধির পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রত্যাশার তুলনায় কম দেশীয় উৎপাদন, উৎসবের আগে চাহিদা বৃদ্ধি, আবহাওয়াজনিত কারণে আখের ক্ষতি, বিশ্ববাজারে চিনির সরবরাহ কমে যাওয়া এবং শিল্পের কিছু অংশের জল্পনা ও মজুতদারি—সব মিলিয়েই চিনির দাম বেড়েছে।
প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় কমেছে চিনি উৎপাদন-
চলতি মরশুমে দেশে প্রায় ৩০৬ লক্ষ মেট্রিক টন (LMT) চিনি উৎপাদন হতে পারে। অথচ আখ উৎপাদনকারী রাজ্যগুলির প্রাথমিক হিসাব ছিল প্রায় ৩৪৩ LMT। আখে রেড রট ও টপ বোরার রোগের পাশাপাশি অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে জল জমে যাওয়ায় উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক অনুমানের তুলনায় উৎপাদন কম হলেও নতুন আখ মাড়াইয়ের মরশুম অক্টোবর মাসে শুরু হওয়া পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত চিনি মজুত রয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্র।
বিশ্বজুড়েই বাড়ছে চিনির দাম-
চিনির সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রবণতা শুধু ভারতেই নয়, গোটা বিশ্বেই দেখা যাচ্ছে। ২০২৬-২৭ মরশুমে বিশ্ববাজারে চিনির ঘাটতি প্রায় ৩৩ LMT হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার আশঙ্কা বিশ্ববাজারের পরিস্থিতিকে আরও প্রভাবিত করেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারেও চিনির দাম দ্রুত বেড়েছে। গত ৩০ জুন প্রতি টন চিনির দাম ছিল ৪৭৪ ডলার। ২০ অগস্ট তা বেড়ে হয়েছে ৫৫২ ডলার। অর্থাৎ দু’মাসেরও কম সময়ে দাম বেড়েছে ১৬ শতাংশের বেশি।
ইথানল কর্মসূচিতে লাভবান আখচাষি ও চিনিকল-
ভারতে সাধারণত বছরে প্রায় ৩২০-৩৪০ LMT চিনি উৎপাদিত হয়। দেশে অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রায় ২৮০-২৯০ LMT। উৎপাদন বেশি হলে অতিরিক্ত চিনি মজুত হয়ে চিনিকলগুলির অর্থ আটকে যায়। এর ফলে আখচাষিদের পাওনা মেটাতেও দেরি হতে পারে। অতিরিক্ত চিনিকে ইথানল উৎপাদনের দিকে সরিয়ে দেওয়ার ফলে এই দীর্ঘদিনের সমস্যা অনেকটাই কমেছে। এর ফলে চিনিকলগুলির আর্থিক অবস্থারও উন্নতি হয়েছে। এর সুফলও দেখা যাচ্ছে। ২০ অগস্ট পর্যন্ত ২০২৫-২৬ চিনির মরশুমে আখচাষিদের প্রাপ্য টাকার ৯৭ শতাংশ ইতিমধ্যেই মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে।
চিনিকলগুলির আর্থিক অবস্থার উন্নতির ফলে সরকারের উপর তাদের নির্ভরতাও কমেছে। ২০১৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে চিনি শিল্পকে প্রায় ১৪,৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলেও ২০২১-২২ সালের পর থেকে এই ধরনের কোনও ভর্তুকি ঘোষণা করা হয়নি। একই সময়ে দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য চিনির দামও মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। ২০২৪ সালের অগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বছরে গড়ে মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ হারে দাম বেড়েছে।
মজুতদারি রুখতে সরকারের কড়া পদক্ষেপ-
সরকারের নজরে এসেছে, চিনিকল ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশের জল্পনা এবং মজুতদারিও সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তাই একাধিক পদক্ষেপ করা হয়েছে—
কেন্দ্র জানিয়েছে, সাধারণ ভোক্তা এবং আখচাষি—উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করাই তাদের লক্ষ্য। চিনির মজুত, দাম এবং বাজারের কার্যকলাপের উপর নজরদারি চলবে। মজুতদারি ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রুখতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ করা হবে। একইসঙ্গে আখচাষিদের পাওনা যাতে সময়মতো মেটানো হয়, তাও নিশ্চিত করা হবে।