
শহুরে ব্যস্ততায় সময় বাঁচাতে অ্যাপ-বাইক এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু এই প্রযুক্তি-নির্ভর পরিষেবাকে কেন্দ্র করে মাঝেমধ্যেই যে সামাজিক অবক্ষয় ও অসহিষ্ণুতার কোলাজ সামনে আসে, তা সত্যিই ভাববার মতো। সম্প্রতি কলকাতায় তেমনই এক ঘটনার ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, যা আরও একবার নাগরিক সৌজন্য এবং সোশাল মিডিয়ায় ঘাপটি মেরে বসে থাকা নীতি পুলিশের দিকে আঙুল তুলেছে। অফিসে পৌঁছনোর তাড়াহুড়োয় এক তরুণীর আচরণ এবং তার পরবর্তী ঘটনাক্রম জন্ম দিয়েছে একাধিক জটিল বিতর্কের। প্রশ্ন উঠছে, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল। প্রশ্ন উঠছে সত্যিই কি তরুণীর অমন ব্যবহার যথাযথ? নাকি তরুণীর ব্যবহারের বদলা নিতে ভিডিয়ো করে সোশাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেওয়ার যে পন্থা রাইডার নিয়েছিলেন, তা যথোপযুক্ত!
ঠিক কী ঘটেছিল তরুণী ও বাইক রাইডারের মধ্যে?
সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিয়ো অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত অফিসে তাড়াতাড়ি পৌঁছনোর তাগিদ থেকে। অভিযোগ, দু’ মিনিট অপেক্ষা করার ধৈর্যটুকুও ছিল না এক কর্পোরেট চাকুরিজীবী তরুণীর। তাই দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছনোর তাগিদে তিনি একসঙ্গে দুটি আলাদা অ্যাপ থেকে দুটি বাইক বুক করেন। যে রাইডার আগে এসে পৌঁছন, তাঁর বাইকেই তিনি উঠে পড়েন এবং দ্বিতীয় রাইডারটিকে লোকেশনে চলে আসা সত্ত্বেও অবলীলায় বাতিল করে দেন। তরুণীর এমন পদক্ষেপ থেকেই বাঁধে গোল। বুকিং বাতিলের কারণ জানতে চাইলে ওই তরুণী তীব্র ক্ষোভ ও উদ্ধত আচরণ প্রকাশ করেন। তেল পুড়িয়ে, ট্র্যাফিক ঠেলে আসা রাইডারের ক্ষোভের জবাবে সহানুভূতির বদলে মেলে চরম দুর্ব্যবহার। ‘তুই’ তোকারি থেকে শুরু করে অশ্রাব্য গালিগালাজ, কটূ কথা। এমনকী, মারধরের হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। রাইডারের ক্যামেরায় বন্দি হওয়া সেই ভিডিও নিমেষেই নেটপাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে। আর তারপর থেকেই শুরু হয় সোশাল মিডিয়ার খাপ পঞ্চায়েত।
ভিডিয়ো সৌজন্যে- তুষার সেনগুপ্তর ফেসবুক
নেটিজেনদের খাপ পঞ্চায়েত এবং তরুণী চাকরি যাওয়া
ভিডিওটি ভাইরাল হতেই নেটদুনিয়া জুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। আধুনিক পোশাক আর গলায় কর্পোরেট আইডি কার্ড ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়ানো ‘শিক্ষিত’ সমাজের একাংশের এই চরম অহংকার ও শ্রমের প্রতি অবজ্ঞাকে ধিক্কার জানান নেটিজেনরা। নেটদুনিয়ার সমালোচনার দাড়িপাল্লায় একদিকে তরুণী ও একদিকে রাইডার। প্রথম প্রথম গোটা দোষের ভার গিয়ে পড়ে তরুণীর দিকেই। অন্তত, ভাইরাল ভিডিয়ো থেকে ধার নেওয়া আরও সব রোস্টিং ভিডিয়োয় এমনই অভিযোগ ওঠে। তবে এখানেই থামে না। তরুণীর মা-বাবার শিক্ষাকে টেনেও ক্ষান্ত দেন না নেটিজেনরা। বরং তরুণীর গলায় ঝোলানো আইডি কার্ড দেখে নেটিজেনরা কলকাতার এক নামী রিয়েল এস্টেট সংস্থাকে ট্যাগ করতে শুরু করেন। সোশাল মিডিয়ায় চাউর হয়ে যায়, চাপের মুখে পড়ে তড়িঘড়ি সংস্থাটি তরুণীর আচরণকে তাঁদের আদর্শ-বিরোধী আখ্যা দিয়ে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে। এমনকী, ভাইরাল হয় কোম্পানির টারমিনেশন লেটারও (যদিও টারমিনেশন লেটারের সত্যতা যাচাই করেনি Tv9Bangla) আর তরুণীর চাকরি যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পরার পর থেকেই গোটা ঘটনায় দুভাগ হয়ে যায় নেটপাড়া। একদল প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, একটি অপরাধের জন্য কি একজন মানুষের রুটি-রুজি কেড়ে নেওয়া কোনও সুস্থ বিচারবুদ্ধির পরিচয়? নেটিজেনদের একাংশও মনে করে, তরুণীর ব্যবহার নিঃসন্দেহে নিন্দনীয় ছিল, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রোলিংয়ের জেরে কারও চাকরি চলে যাওয়া একপ্রকার বিপজ্জনক প্রবণতা।
রাইডার মুখ খুললেন
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সামনে আসে আরও এক চাঞ্চল্যকর মোড়। পরবর্তীতে ভাইরাল হওয়া আরেকটি ভিডিওতে (যার সত্যতা যাচাই করেনি Tv9Bangla) স্বয়ং ওই বাইক চালককে সুর নরম করতে দেখা যায়। তিনি জানান, ওই তরুণীর ওপর যেভাবে সবাই চড়াও হচ্ছে, তা দেখে তাঁর নিজেরই খারাপ লাগছে। তিনি স্বীকার করেন, বুকিংটি যে ১০ মিনিট আগেই বাতিল হয়ে গিয়েছিল, তা তিনি খেয়াল করেননি। ভুল যে দুই পক্ষেরই ছিল, তা মেনে নিয়ে তিনি জানান, তাঁদের মধ্যে বিষয়টি মিটে গিয়েছে। কোনও পক্ষই থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেনি। এটাও জানা যায়। যদিও রাইডারের এই ভিডিয়োটি এই মুহূর্তে সোশাল মিডিয়ায় পাওয়া যাচ্ছে না।