
সময়টা১৯০৫ সাল। তখন উত্তাল বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা জন্ম দিয়েছিল এক বিকল্প জাতীয় ভাবনার। সেই ঐতিহাসিক পটভূমিতেই ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার শিকল ভেঙে বিজ্ঞানের সঙ্গে জাতীয়তাবাদের মেলবন্ধন ঘটাতে আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন’ বা এনসিই-র। পরবর্তীতে, ১৯৫৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর এই প্রতিষ্ঠানই পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। আত্মপ্রকাশের এই নতুন লগ্নেই প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল এমন এক প্রতীকের, যা কেবল কোনও প্রতিষ্ঠানের সিলমোহর বা এমব্লেম হবে না; ধারণ করবে তার বিদ্রোহী সত্তা,আত্মপরিচয় ও দর্শনকে।
যাদবপুরের সেই আত্মাকে চিত্রিত করার গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল কিংবদন্তি নন্দলাল বসুর ওপর। শান্তিনিকেতনের কলাভবনের তৎকালীন অধ্যক্ষ, যাঁর তুলিতে রূপ পেয়েছিল ভারতের মূল সংবিধানের পাণ্ডুলিপি কিংবা ‘ভারতরত্ন’-এর স্মারক নকশা, তিনি ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পরিচিত অহঙ্কার— ভারী ঢাল বা মুকুটের নকশা হেলায় প্রত্যাখ্যান করেন। বেঙ্গল স্কুল অফ আর্টের চিরায়ত আধ্যাত্মিকতা ও সরলতাকে পুঁজি করে তিনি এঁকেছিলেন এমন এক নকশা, যা আজ সাত দশক ধরে জাতীয় বোধ ও প্রগতির এক দীপশিখা হয়ে জ্বলছে।
নান্দনিকতা ও দর্শনের মেলবন্ধনে তৈরি সেই লোগোর বাইরের বলয়ে রয়েছে প্রস্ফুটিত পদ্মের পাপড়ি, যা দেশজ চারুকলা, সংস্কৃতি ও পবিত্রতার এক চিরন্তন বার্তা বহন করে। লোগোর ঠিক কেন্দ্রে স্থান পেয়েছে একটি মাটির প্রদীপ— অজ্ঞতার আঁধার চিরে জ্ঞানের আলো ছড়ানোর প্রতীক। কিন্তু এই রূপকল্পের আসল গভীরতা লুকিয়ে রয়েছে প্রদীপের তিনটি শিখার মধ্যে, যা শিক্ষার তিনটি মৌলিক স্তম্ভকে চিহ্নিত করে:
বাম দিকের শিখা: এটি ‘বৌদ্ধিক প্রশিক্ষণ’-এর রূপক। বৈজ্ঞানিক মানসিকতা, অ্যাকাডেমিক শৃঙ্খলা ও বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান অর্জনের তাগিদ ফুটে উঠেছে এই শিখায়।
মাঝের শিখা: এটি মানুষের ‘আবেগ ও কল্পনাশক্তি’-র বিকাশের কথা বলে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিকতা, শিল্প এবং সহানুভূতির সহাবস্থানকে এটি নির্দেশ করে।
ডান দিকের শিখা: এটি ইঙ্গিত করে ‘আধ্যাত্মিক বিকাশ’ ও নৈতিক চেতনাকে। কেবল অক্ষরজ্ঞান নয়, বরং চরিত্র গঠন ও মানসিকভাবে নিজেকে উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার পথ দেখায় এই শিখা।
প্রদীপের শিখা থেকে বিচ্ছুরিত এই আলোক বলয়কে পূর্ণতা দিয়েছে সংস্কৃতে খোদাই করা সেই অমলিন মন্ত্র— ‘জাতম্ অস্তি বৃদ্ধি প্রাপ্নুয়াৎ’। ইংরেজিতে যা হয়েছে— ‘To Know Is To Grow’। অর্থাৎ, জানার মধ্য দিয়েই প্রকৃত বৃদ্ধি ও রূপান্তর ঘটে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এমব্লেম কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রতীকমাত্র নয়, বরং এটি দর্শন। পরাধীন ভারতের স্বদেশি ঐতিহ্য থেকে আধুনিক জ্ঞানচর্চার আধার হয়ে ওঠার সেই দীর্ঘ যাত্রাকে নন্দলাল বসু তাঁর তুলির সংক্ষিপ্ত টানে চিরস্থায়ী করে গিয়েছিলেন।