
বাঙালির স্মৃতির সিন্দুকে প্রতিটি জনপদের নামের পেছনে লুকিয়ে থাকে এক একটি দীর্ঘ ইতিহাস। কোনওটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে লোকগাথা, আবার কোনওটির সঙ্গে রাজকাহিনি। তেমনই এক অনন্য ইতিহাসের সাক্ষী হুগলি জেলার দ্বারকেশ্বর নদীতীরের প্রাচীন শহর ‘আরামবাগ’। কিন্তু আজ যাকে আমরা আরামবাগ বলে জানি, চিরকাল কি তার এই নাম ছিল? কেনই বা এই জনপদের নামের সঙ্গে জড়িয়ে গেল ‘আরাম’ ও ‘বাগ’ (বাগান)—এই দুটি শব্দ? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বর্তমানের এই শান্ত-স্নিগ্ধ আরামবাগের গর্ভে লুকিয়ে রয়েছে এক প্রাচীন ও বৈপ্লবিক রূপান্তরের ইতিহাস।
আজকের আরামবাগের পূর্বতন নাম ছিল ‘জাহানাবাদ’। এই নামের পেছনে রয়েছে মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাস। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, মোগল সম্রাট শাহজাহানের নামানুসারে এই অঞ্চলের নামকরণ হয়েছিল জাহানাবাদ। আবার অন্য একটি মত অনুযায়ী, সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কন্যা জাহানারা বেগমের নাম থেকে এই জাহানাবাদ নামের উৎপত্তি। সপ্তদশ শতকে এই অঞ্চলটি ছিল মোগল সাম্রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক কেন্দ্র। মানসিংহের উড়িষ্যা অভিযানের সময়ও এই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব প্রকাশ পেয়েছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলেও, ১৮১৮ সালে যখন প্রথম এই অঞ্চলকে পৃথক থানা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং ১৮৪৬ সালে মহকুমা গঠিত হয়, তখনও এর দাপ্তরিক নাম ছিল জাহানাবাদ।
তাহলে ‘জাহানাবাদ’ কীভাবে ‘আরামবাগ’ হয়ে উঠল?
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এবং বিশ শতকের শুরুতে জাহানাবাদ ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল এক ভয়াবহ মহামারীর গ্রাসে পড়ে। ‘বর্ধমান জ্বর’ বা ম্যালেরিয়ার প্রকোপে এই অঞ্চলের জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। মহামারীর পাশাপাশি যোগ হয়েছিল ম্যালেরিয়া-পরবর্তী ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারান, গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যায়। একসময়ের সমৃদ্ধ জাহানাবাদ আক্ষরিক অর্থেই এক ‘মৃত নগরী’ বা শ্মশানে পরিণত হয়েছিল। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক ছিল যে, মানুষ ‘জাহানাবাদ’ নামটিকে একপ্রকার অপয়া বা অভিশপ্ত বলে গণ্য করতে শুরু করেন।
এই মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক ও নেতিবাচকতা থেকে স্থানীয় মানুষকে মুক্ত করতে ১৯০০ সালের শুরুর দিকে উদ্যোগী হন তত্কালীন ব্রিটিশ সরকার এবং স্থানীয় বিদগ্ধ সমাজ। ১৯০০ সালের ১৯ এপ্রিল (কারও মতে ১৯০১ সাল) এক সরকারি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ‘জাহানাবাদ’ নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘আরামবাগ’।
‘আরামবাগ’ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ‘আরামের বাগান’ বা ‘বিশ্রামের উদ্যান’। মহামারীর সেই ভয়াল দিনগুলো কাটিয়ে এই অঞ্চলের মানুষ যাতে নতুন করে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারেন, বুক বেঁধে বাঁচতে পারেন এবং জীবনে ‘আরাম’ বা স্বস্তি ফিরে পান—সেই উদ্দেশ্যেই এই নতুন নামকরণ। দ্বারকেশ্বর নদের শীতল হাওয়া এবং চারপাশের সবুজ প্রকৃতি মিলিয়ে এই অঞ্চলটি সত্যিই যেন এক ক্লান্তিনাশক উদ্যান হয়ে উঠেছিল।
আজকের আরামবাগ কেবল কৃষি ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রই নয়, এটি রাজা রামমোহন রায়ের জন্মভিটে (রাধামণিপর/খানাকুল) এবং প্রফুল্লচন্দ্র সেনের মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্বের কর্মভূমি। ইতিহাসের সেই ‘জাহানাবাদ’ আজ ধুলো চাপা পড়েছে ঠিকই, কিন্তু ‘আরামবাগ’ নামের প্রতিটি অক্ষরে মিশে আছে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই, পুনর্জন্ম এবং শান্তির এক চিরন্তন আখ্যান।
তবে ইতিহাসে রয়েছে আরও একটি তথ্যও। জানা যায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শেষভাগ পর্যন্ত তৎকালীণ জাহানাবাদ পরগণার ভৌগলিক অবস্থান ছিল ঘাটাল,চন্দ্রকোনা,আরামবাগ,কোতুলপুর রায়না থানা সীমানা পর্যন্ত। বিহারের গয়া জেলায় জাহানাবাদ বলে একটি স্থান থাকার জন্য যাতে দুটি স্থানের মধ্যে গোলযোগ না হয় সেই জন্য জাহানাবাদ থেকে আরামবাগ নামকরণ করা হয়। এটি প্রকাশ হয় ১৯০০ খ্রীস্টাব্দে ২৫শে এপ্রিল তারিখে কলিকাতা গেজেটের এক বিজ্ঞপ্তিতে।
তথ্যসূত্র- হুগলি জেলা ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ, সুধীরকুমার মিত্র, বাঙালির ইতিহাস, নীহাররঞ্জন রায়। আমারবাগের সেকাল ও একাল, অজয় বেরা, বাংলার ইতিহাস, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, উইকিপিডিয়া।