
কলকাতা: মেরেকেটে পাঁচ ফুট মতো! কলাপসিবল গেটের জন্য দু’পাশটা আরও খানিকটা চাপা। সেটাই মূল প্রবেশ পথ বিল্ডিংয়ের। লোহার কলাপসিবল গেটের চর্তুদিকে ঝুলছে বোর্ড। তাতে এক-একটা হোটেলের নাম লেখা। মোট ৬! অর্থাৎ পুরনো সেই ঝরঝরে ভবনের প্রত্যেকটা তলায় হোটেল। ঘরের ভিতর থেকে ঘর, তার ভিতরে ঘর! একেবারের গোলক ধাঁধা। ঢুকলে হারিয়ে যাওয়ার সামিল। আর পাঁচ তলা সেই ভবনের সিঁড়ি লোহার সরু বেঁকানো। কারণ স্পেস তো নেই সিঁড়ি করার। সামনে কেবল দেড় ফুটের প্যাসেজ। খুপরি খুপরি হোটেল! নিউমার্কেটের মির্জা গালিব স্টিটে ঢুকলে অবাক হবেন বইকি! ট্রেড লাইসেন্স পেল কীভাবে? এ প্রশ্ন TV9 বাংলা তুলছে না। বরং তুলছেন খোদ দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী।
তারাপীঠের হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর ঘটনার রেশ কাটিয়ে ওঠার আগেই বুধবার মাঝরাতে জ্বলে উঠল মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেল ‘শিখাহীন’! প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, এসির শর্ট সার্কিট থেকেই আগুন লেগেছে। জানা যাচ্ছে, আগুন লেগেছে রাত আড়াইটে। সেসময়ে ঘুমোচ্ছিলেন সকলে। টের পাওয়ার পর অনেকে বেরোতে পারলেন পারেননি ৯ জন। জানা যাচ্ছে দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছে তাঁদের। ওই হোটেলে কোনও ফায়ার এক্সিটও ছিল না। দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী প্রশ্ন তুলছেন, “এই ধরনের হোটেলগুলো ট্রেড লাইসেন্স পেল? মির্জা গালিব স্ট্রিটে আমাদের একটা অফিস রয়েছে। তার পাশেই ওই বিল্ডিংটা। ওখানে প্রত্যেকটা ফ্লোরেই ছোট ছোট হোটেল রয়েছে। সেখানে পাশাপাশি দুটো লোক নড়তে পারবেন না। কোনও এক্সটার্নাল সিঁড়ি নেই, যেখান থেকে বিপদে মানুষকে উদ্ধার করা যাবে। দেখলে অবাক হয়ে যাবেন।” তিনি জানিয়েছেন,এই ধরনের হোটেলের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে।
নিউমার্কেটের মতো ঘিঞ্জি এলাকায় এরকম বেশিরভাগ বিল্ডিংই অনেক বছরের পুরনো। সেখানেই গজিয়ে উঠেছে একের পর এক হোটেল। ভিতর একেবারে ঘুণে খাওয়া। সানমাইকা, প্লাইউড দিয়ে ডেকরেশন করা হয়েছে সব। সৌন্দর্যায়নের মাধ্যমে কাস্টোমার টানাই মূল লক্ষ্য। নিরাপত্তা-সুরক্ষায় কোনও নজরদারি নেই। এই বিল্ডিংটাও অনেক পুরনো। কিন্তু এরা ট্রেড লাইসেন্সটা পেল কীভাবে?
পূর্বতন সরকারের আমলে জোড়াসাঁকো হোটেলে অগ্নিকাণ্ডের তিন দিনের মধ্যেই অডিট কমিটি গঠিত হয়। অডিট কমিটি কলকাতা পৌরসভায় চারটি বৈঠক করে। সিদ্ধান্ত হয়, কলকাতায় যত ব্যাঙের ছাতার মতো হোটেল গজিয়ে উঠেছে, তাতে যথাযথ সব নিয়ম মানা হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে। কিন্তু পুরসভা সূত্রের খবর, এটা করতে যে পরিমাণ লোকবল দরকার ছিল দমকল দফতরের, তা ছিল না। লোকের অভাবেই থার্ড পার্টির ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। দেখা যায়, কলকাতা পৌরসভায় ৩৭৮৮ এরকম হোটেল রয়েছে, মাত্র ১৫-২০টি হোটেলেই আগুন লাগানো সম্ভব হয়েছিল। তাদের কাছে লোকবলই ছিল না। অডিটের রিপোর্ট পুরসভা ও দমকল দফতরের কাছে জমা পড়েনি। চারটি বৈঠকের পর আর বৈঠকই হয়নি। আর তার মাশুল দিতে হল আরও ৯ জনকে!
প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলছেন, “দমকলের কাছে লোক ছিল না বলে থার্ড পার্টি অডিট টিম তৈরি করার কথা বলেছিলাম। নজরদারি তো পৌরসভা করে না। নজরদারি তো দমকলের দেখার কথা। ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছিল কিনা, আমি কীভাবে বলব?”