
কলকাতা: রাজ্যে সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ করে ‘সেবাশয় ক্যাম্প’ আয়োজন করতেন স্থানীয় সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। দাবি করা হতো, লক্ষ লক্ষ মানুষ এই ক্যাম্প থেকে সরাসরি চিকিৎসা পরিষেবা পাচ্ছেন। কিন্তু সেই প্রচারের আড়ালে থাকা এক চরম বাস্তব ও প্রতারণার চিত্র! প্রকাশ্যে এল সাতগাছিয়া বিধানসভার বোরহানপুর গ্রামের চিত্তরঞ্জন মান্নার পরিবারে।
চিত্তরঞ্জনের মেয়ে কৃতি মান্না ‘আটারিও ভেনাস মেল ফর্মেশন’ (High Flow AVIM) নামক এক অত্যন্ত জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। যার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন লক্ষ লক্ষ টাকা। পেশায় ড্রাইভার চিত্তরঞ্জন মেয়ের চিকিৎসার আশায় একদিন তাকে সাতগাছিয়ার সেবাশয় ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে স্বয়ং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শিশুটিকে দেখেন এবং তার বাবা-মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিশ্রুতি দেন”এই বাচ্চার চিকিৎসা এবং পড়াশোনার সমস্ত দায়িত্ব আজ থেকে আমার।”
পরিবারের অভিযোগ, সেই ক্যাম্প শেষ হওয়ার পর আজ পর্যন্ত কোনও সাহায্য মেলেনি। সাংসদের সঙ্গে দেখা করতে বহুবার তাঁর বাড়িতে গেলেও দেখা পাননি তাঁরা। সাংসদ তহবিলের উদ্যোগে শুধু একবার কলকাতার আরজি কর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল কৃতি ও তার মাকে। কিন্তু সেখানকার চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দেন, এই জটিল রোগের চিকিৎসা পশ্চিমবঙ্গে সম্ভব নয়, একে চেন্নাই নিয়ে যেতে হবে যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
এরপর সাহায্যের আশায় কৃতির মা কম করে ২০ থেকে ২৫ বার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিসে চক্কর কাটেন। কিন্তু কোনও সুরাহা তো মেলেইনি, উল্টে শেষমেশ অফিস থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়— অভিষেককে কোনও চিকিৎসা করাতে পারবেন না।
অথচ, সাংসদের নিজস্ব সাংগঠনিক বই ‘নিঃশব্দ বিপ্লব’-এর ৩২৩ পাতায় কৃতি মান্না ও তার মায়ের ছবি ছাপিয়ে ফলাও করে লেখা হয়েছে— “বাচ্চাটির দায়িত্ব নেওয়া হলো।” পরিবারের লোকজন ক্ষোভে ফেটে পড়ে প্রশ্ন তুলছেন, যখন তিনি দায়িত্ব নিলেনই না, তখন কোন অধিকারে তাঁদের ছবি বইতে ছাপিয়ে মিথ্যা প্রচার করা হলো? সেবাশয় ক্যাম্প আসলে সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার একটি বড় ভাঁওতাবাজি।
চিত্তরঞ্জন বলেন, “অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন করবেন। আমরা অনেকগুলো মাস ওনার পিছনে দৌঁড়েছিলাম। টাকাই ছিল না। তারপর হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে অপারেশন করাতে অনেক দেরি হয়ে গেল। হাতটা পুরোটাই বাদ গিয়েছে।”
কৃতির বাবা একজন সামান্য চালক হওয়ায় মেয়ের চিকিৎসার বিপুল খরচ চালানো তাঁর পক্ষে অসম্ভব। চিকিৎসকদের মতে, শিশুটির এখনও দুটি বড় অপারেশন বাকি, যার জন্য প্রয়োজন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ টাকা। নিরুপায় হয়ে এই অসহায় পরিবারটি এখন রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে কাতর আবেদন জানিয়েছেন। এই প্রতারণার হাত থেকে বাঁচিয়ে সরকার যেন কৃতি মান্নার চিকিৎসার পাশে এসে দাঁড়ায় এবং শিশুটির জীবন রক্ষা করে, এখন সেটাই তাদের একমাত্র আশা।