21 July: উত্তরাধিকার হারাচ্ছেন মমতা? ২১ জুলাই এবার কার?

গত ১৫ বছরে অনেক কিছুর সাক্ষী হয়েছে একুশের মঞ্চ। সিপিএমের বিরুদ্ধে স্লোগান বদলে নিশানায় আসে বিজেপি, মুকুল রায়ের বদলে সেকেন্ড ম্যান হয়ে মঞ্চে জায়গা পান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, হাজারের বদলে লাখে শুরু হয় গুনতি। তবে সবার শেষে একুশ ছিল মমতার ক্ষমতা প্রদর্শের মঞ্চ, রাজনৈতিক আস্ফালনের প্লাটফর্ম।

21 July: উত্তরাধিকার হারাচ্ছেন মমতা? ২১ জুলাই এবার কার?
Image Credit source: Facebook

Jul 16, 2026 | 7:53 PM

‘আপনি নিশ্চিত ওটা ১০,০০০ হবে তো? ২০০০ হলে ভাবতে পারি।’

‘না না, ৫০০০-এর কম করবেন না।’

না, কোনও চলতি বাজারের দরাদরি নয়, এটা হাইকোর্টের এজলাসে বিচারপতি আর আইনজীবীর কথোপকথন। বিষয় ২১ জুলাই। সেই ২১ জুলাই, যেখানে লাখে হিসেব হত। মঞ্চেই থাকত প্রায় শ খানেক লোক। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্ঠস্বর শুনতে কত লোক আসত, সঠিক হিসেব বলা কারও পক্ষেই সম্ভব হত না। বদলেছে স্লোগান, বদলেছে প্রতিপক্ষ, বদলেছে নেতা, বদলেছে ধরন-ধারণও। শুধু কনস্ট্যান্ট ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে ৩৩ বছর পর এবার এক অভিনব ২১ জুলাই দেখতে চলেছে বাংলা। লোক সংখ্যা নিয়ে চলছে দর কষাকষি। আসল তৃণমূল-নকল তৃণমূলের লড়াইয়ের মাঝেই এবার ‘আসল ২১ জুলাই’ কার?

কতজন লোক আসবে? কোন জেলা থেকে আসবে, এসব পরের প্রশ্ন। প্রশ্ন হল কোথায় আসবে? গত ১৫ বছর ধরে এক বার্ষিক উৎসবে পরিণত হওয়া ২১ জুলাই যাঁরা কলকাতায় আসতেন, তাঁরাও কি এখন আসল নকলের টানাপোড়েনে? কোন মঞ্চের সামনে যাবেন? কোথায় থাকবে শহিদ পরিবার?

১৯৯৩ সালে যুব কংগ্রেসের ব্যানারে যাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আন্দোলন করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছিলেন, তাঁদের শ্রদ্ধা জানাতেই এই ২১ জুলাই পালন। একুশের অধিকার কংগ্রেসের নাকি তৃণমূলের? এ বিতর্ক চিরকালই ছিল। কিন্তু একুশের কপিরাইট কখনই ছাড়েননি মমতা। কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল তৈরি করার পর একুশও চলে যায় তৃণমূলে। মমতার পথেই দিনে দিনে দাপট বেড়েছে, জৌলুস বেড়েছে একুশের। আর এবার তৃণমূলই ভেঙে ছারখার। ছিন্নভিন্ন একুশও। রাস্তার একটা অংশে সভা করতে এখন আদালতে ছুটতে হচ্ছে মমতাকে। কত লোক নিয়ে সভা করবেন, সেটাও বেঁধে দিচ্ছে হাইকোর্ট। ১০ হাজার লোক হবে কি না, সন্দেহ প্রকাশ করছেন খোদ বিচারপতি! কেউ কেউ বলেন, এই একুশে জুলাইতেই তৃণমূল তৈরির বীজ বপণ হয়েছিল। সেই উত্থান থেকে পতন। একুশও যেন একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ করতে চলেছে এবার।

এখনও পর্যন্ত যা খবর, তাতে শহরের তিন জায়গায় ২১ জুলাই পালন হবে। শহিদ মিনারে পালন করবে কংগ্রেস, গান্ধীমূর্তির পাদদেশে সভা হবে ঋতব্রত শিবিরের। আর বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের একদিকের রাস্তায় সভা করার অনুমতি জুটেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তবে অবাক হবেন না, যদি আরও একটা ২১ জুলাই পালন হয়। ইতিমধ্য়ে সেই ইঙ্গিতও মিলেছে।

বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার বলেছেন, “শহিদ দিবস সবার। আমরাও নিজেদের মতো করে শহিদ দিবস পালন করব।”

এনডিএ তথা বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন জানানোর কথা বলেও ২১ ভুলতে পারছেন না কাকলিরা। ভুলবেন বা কী করে? সেদিন তো তিনিও ছিলেন রাস্তায়। তাঁর মতো এমন অনেকেই ১৯৯৩ সালের সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনে সামিল ছিলেন, যাঁদের সঙ্গে আজ মমতার যোজন দূরত্ব। কাকলি ঘোষ দস্তিদার, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়রা সেই দিন ভুলে যান কী করে? তবে এখনও পর্যন্ত এই এনসিপিআই-তে মিশে যাওয়া সাংসদদের তরফে কোনও পৃথক ২১ জুলাই পালনের কথা বলা হয়নি।

তবে এবার যাঁদের ২১ সবথেকে বেশি আলোচিত, যাঁদের টিমে নাকি মেসি-রোনাল্ডো সবাই আছেন, তাঁদের কাছেই ২১-এর শক্তি প্রদর্শন সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপন সাহাদের বক্তব্য, শহিদরাই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ।

যে নেতাদের সঙ্গে ৩৩ বছর আগে ২১ জুলাইয়ের দূর পর্যন্ত কোনও সংযোগ নেই, তাঁরাই এবার বোঝাচ্ছেন, একুশের গুরুত্ব ঠিক কতটা?

অনুব্রত, মদন মিত্র দাবি করছেন, তাঁরাই প্রত্যেক বছর ২১ জুলাই লাখ লাখ লোক আনেন। প্রশ্ন ও পারেন, তাহলে ৫০০-৭০০ লোকের জন্য কেন আবেদন করলেন তাঁরা? আদালতেই উঠে এসেছে যে গান্ধীমূর্তির পাদদেশে ৫০০ থেকে ৭০০ লোকের অনুমতি মিলেছে ঋতব্রতদের। যা নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি কালীঘাট শিবির।

তবে যিনি উত্তরাধিকারের মতো ২১ জুলাই সযত্নে নিজের কাছে রেখে এসেছেন, ভয় যাচ্ছে না তাঁরও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশঙ্কা, ভয় দেখানো হতে পারে ডেকরেটার্সের লোককেও। কর্মী-সমর্থকদের অন্যসভায় পাঠিয়ে দিতে পারে পুলিশ।

গত ১৫ বছরে অনেক কিছুর সাক্ষী হয়েছে একুশের মঞ্চ। সিপিএমের বিরুদ্ধে স্লোগান বদলে নিশানায় আসে বিজেপি, মুকুল রায়ের বদলে সেকেন্ড ম্যান হয়ে মঞ্চে জায়গা পান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, হাজারের বদলে লাখে শুরু হয় গুনতি। তবে সবার শেষে একুশ ছিল মমতার ক্ষমতা প্রদর্শের মঞ্চ, রাজনৈতিক আস্ফালনের প্লাটফর্ম। আর এবার, সেই একুশ শুধু জানান দেওয়ার মঞ্চ যে মমতা আছেন। আর ২১-এ সেই ১৩ জনের মৃত্যুর দায় কার? চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্ট কেন কোনওদিন প্রকাশ্য়ে এল না? সে সব প্রশ্ন এখন স্মৃতির অতলে।

সম্প্রতি কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বলেছেন, ‘ এবার তো আবার বিজেপিও একুশে জুলাই পালন করছে।’ এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, ২১ জুলাই এবার বিধানসভায় রয়েছে অধিবেশন। রয়েছে বাজেট সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। এবার ক্ষমতায় থাকা বিজেপি অবশ্য লোকসংখ্যা নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়ছেন না।

আদালতে যা আবেদন, তাতে তিনখানা সভা মিলেও লাখ খানেক লোকের হিসেব নেই। এবার কি সেই জনজীবন স্তব্ধ করা ২১ দেখবে বাংলা? অঘোষিত ছুটি পালন হবে এবার? উত্তর মিলবে একুশেই।

Follow Us