
বাঙালি মানেই শেষ পাতে একটু মিষ্টি মুখ। আর তা যদি হয় উৎসবের মরসুম বা রবিবারের দুপুরের এলাহি ভূরিভোজ, তবে তো কথাই নেই। কষা খাসির মাংস বা ঝাল ঝাল মুরগির মাংসের পদ দিয়ে পেটপুজো করার পর, শেষ পাতে এক বাটি ঠান্ডা নলেন গুড়ের পায়েস কিংবা ক্ষীর না পড়লে ঠিক জমে না। কিন্তু জানেন কি, রসনাতৃপ্তির এই চিরপরিচিত অভ্যাসটিই আপনার অজান্তে শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করছে? আমাদের সনাতন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র এবং আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান— দুই তরফেই মাংস খাওয়ার ঠিক পরপরই দুগ্ধজাত খাবার, বিশেষ করে পায়েস খেতে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
কিন্তু কেন এই দুটি পদের যুগলবন্দিকে এত বিপজ্জনক মনে করা হয়? আসুন জেনে নেওয়া যাক এর পেছনের আসল কারণগুলো—
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে কিছু খাবারের সংমিশ্রণকে ‘বিরুদ্ধ আহার’ বা ক্ষতিকর খাদ্য সংমিশ্রণ বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মাংসের প্রকৃতি হলো অত্যন্ত গরম (উষ্ণ বীর্য), যা শরীরে তাপ উৎপন্ন করে। অন্যদিকে, দুধ বা পায়েসের প্রকৃতি হল শীতল । এই বিপরীতধর্মী দুটি খাবার যখন খুব কম সময়ের ব্যবধানে পাকস্থলীতে পৌঁছয়, তখন শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য সম্পূর্ণ বিঘ্নিত হয়। এর ফলে রক্তে টক্সিন বা বিষাক্ত উপাদানের মাত্রা বাড়তে শুরু করে।
আমেরিকার এক মেডিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণাপত্র অনুযায়ী, মাংসা জাতীয় খাবারের পর কখনই দুগ্ধজাতীয় খাবার খেতে নেই। কেননা, মাংস এবং পায়েস— দুটিই অত্যন্ত ভারী খাবার। মাংস পরিপাক করতে আমাদের পরিপাকতন্ত্রকে প্রচুর পরিমাণে অ্যাসিড এবং এনজাইম ক্ষরণ করতে হয়। ঠিক সেই সময়ই যদি পেট পুরে দুধ বা পায়েস খাওয়া হয়, তবে দুধ পাকস্থলীর সেই পাচক রসকে পাতলা করে দেয়। ফলে মাংস ঠিকমতো হজম হতে পারে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে লিভার ও অন্ত্রের ওপর।
মাংসের প্রোটিন এবং দুধের ক্যাসিন প্রোটিন যখন একসাথে পেটে মেশে, তখন হজমক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। খাবার পেটের ভেতর দীর্ঘক্ষণ জমে থাকার কারণে তা পচতে শুরু করে। যার ফলস্বরূপ বুক জ্বালা, তীব্র অ্যাসিডিটি, পেট ফাঁপা, গ্যাস এবং পেট ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে এর পরপরই বমি বা ডায়েরিয়ার সমস্যাও শুরু হয়ে যায়।
তবে উপায় কী?
খাদ্যরসিক বাঙালি কি তবে মাংসের পর পায়েসের স্বাদ থেকে বঞ্চিতই থাকবে? পুষ্টিবিদদের মতে, বঞ্চিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে মানতে হবে সময়ের সঠিক ব্যবধান।
আপনি যদি দুপুরে বা রাতে ভারী মাংসের পদ খান, তবে অন্তত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পর পায়েস বা মিষ্টি জাতীয় দুগ্ধজাত খাবার খান।
সবচেয়ে ভালো হয় যদি এই দুটি পদের মধ্যে যেকোনও একটিকে দুপুরের মেনুতে এবং অন্যটিকে রাতের মেনুতে রাখা যায়।
সুতরাং, পরের বার মাংস-ভাতের পর পায়েসের বাটিটি টানার আগে একটু ভাবুন। ক্ষণিকের জিভের স্বাদ যেন দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক অসুস্থতার কারণ না হয়ে দাঁড়ায়!