
দৈনন্দিন জীবনে আমাদের সবচেয়ে পরিচিত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোর মধ্যে একটি হল ‘সেফটি পিন’। শাড়ি বা জামাকাপড় আটকানো থেকে শুরু করে জরুরি মুহূর্তে ছেঁড়া পোশাক সামলানো কিংবা গৃহস্থালির নানা কাজে— এই ক্ষুদ্র ধাতব পিনটির ভূমিকা অপরিসীম। আপাতদৃষ্টিতে এটি খুব সাধারণ ও সস্তা একটি বস্তু মনে হলেও, এর নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে ১৭০ বছরেরও বেশি পুরনো ইতিহাস এবং এক নিখুঁত বৈজ্ঞানিক নকশা।
আধুনিক সেফটি পিনের উদ্ভাবক হলেন মার্কিন মেকানিক ওয়াল্টার হান্ট (Walter Hunt)। ১৮৪৯ সালে বন্ধু জে আর চ্যাপিনের থেকে নেওয়া মাত্র ১৫ ডলারের একটি বকেয়া ঋণ শোধ করার চিন্তায় মগ্ন ছিলেন হান্ট। সেই সময় টেবিলে পড়ে থাকা ৮ ইঞ্চি লম্বা একটি ধাতব তার হাত দিয়ে পেঁচাতে পেঁচাতে মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে তিনি তৈরি করে ফেলেন এক নতুন ধরনের পিনের নকশা।
১৮৪৯ সালের ১০ এপ্রিল তিনি এই উদ্ভাবনের পেটেন্ট (Patent) পান। পরবর্তীতে মাত্র ৪০০ ডলারে তিনি সেই পেটেন্টের স্বত্ব বিক্রি করে দেন এবং নিজের ১৫ ডলারের ঋণ মেটান। যদিও হান্টের কাছ থেকে স্বত্ব কেনা সংস্থাটি এই পিন বিক্রি করে পরবর্তীতে লক্ষ লক্ষ ডলার উপার্জন করেছিল।
যদিও ওয়াল্টার হান্ট আধুনিক স্প্রিং-যুক্ত সেফটি পিনের জনক, তবে এর ধারণার বীজ রোপিত হয়েছিল হাজার বছর আগেই। প্রাচীন গ্রিক, রোমান ও মাইসিনীয় সভ্যতায় ‘ফিবুলা’ (Fibula) নামে এক ধরণের ধাতব অলঙ্কার ও পিন ব্যবহার করা হতো, যা পোশাক আটকে রাখার কাজে লাগত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রাচীন ফিবুলাই আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় আজকের সেফটি পিনে রূপ নিয়েছে।
স্প্রিং লুপ (Coiled Spring): পিনের একদম নিচের গোল প্যাঁচানো অংশটি একটি স্প্রিং হিসেবে কাজ করে। এটি পিনের দুটি বাহুকে বাইরের দিকে ঠেলে রাখতে ধারাবাহিক চাপ বা ‘টেনশন’ তৈরি করে।
তীক্ষ্ণ সুঁচালো মুখ: যা সহজেই কাপড়ের বুননের মধ্য দিয়ে গলে ভেতরে ঢুকে যেতে পারে।
এটিই এই পিনের আসল জাদু। পিনের সুঁচালো মুখটিকে যখন এই ছোট ক্যাপটির ভেতর চেপে বসিয়ে দেওয়া হয়, তখন স্প্রিংয়ের টানের কারণে তা লক হয়ে যায়। ফলে আঙুলে বা শরীরে সুঁচ ফুটে রক্ত বের হওয়ার কোনও ঝুঁকি থাকে না। এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কারণেই এর নাম রাখা হয়েছে ‘সেফটি’ পিন।
গত ১৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আধুনিক প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়ন হলেও, ওয়াল্টার হান্টের তৈরি সেফটি পিনের মূল নকশায় কোনও পরিবর্তন আনার প্রয়োজন পড়েনি। এত কম খরচে নিখুঁত মেকানিক্যাল ডিজাইন এবং নিরাপত্তার এমন মেলবন্ধন আর দ্বিতীয়টি নেই বলেই মনে করেন বিজ্ঞানীরা।