
জ্যৈষ্ঠের চড়া রোদে জামাইবাবু শ্বশুরবাড়িতে পা রাখতেই শাশুড়ি মায়েরা নতুন কাপড়ে বরণডালা সাজিয়ে তৈরি হন। ধান, দূর্বা, পাঁচ ফল দিয়ে জামাইকে আশীর্বাদ করার সময় তালপাতার পাখা দিয়ে হাওয়া করার এবং মুখে ‘ষাট ষাট’ বলার নিয়মটি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে কেবলই গরম থেকে স্বস্তি দেওয়ার একটি লৌকিক আচার মনে হলেও, এর নেপথ্যে রয়েছে সন্তান ও পরিবারের দীর্ঘায়ু কামনার এক গভীর মনস্তত্ত্ব।
আসলে এই প্রথায় শাশুড়িরা যে ‘ষাট’ শব্দটি উচ্চারণ করেন, তা কোনও সংখ্যা বা ‘৬০’ নয়। লৌকিক বিশ্বাস অনুযায়ী, এটি এসেছে দেবী ষষ্ঠীর নাম থেকে। আবার সংস্কৃত শব্দ ‘ষষ্টি’ (যার অর্থ রক্ষা করা) বা ‘স্বস্তি’ (যার অর্থ কল্যাণ) থেকেও এই ‘ষাট’ শব্দের উৎপত্তি বলে মনে করেন অনেক ভাষাবিদ ও পণ্ডিত।
শাশুড়ি মা যখন জামাইয়ের মাথায় পাখা দিয়ে হাওয়া করেন এবং ‘ষাট ষাট’ বলেন, তখন তিনি মূলত জামাইয়ের উদ্দেশ্যে দেবী ষষ্ঠীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। এর আসল অর্থ হল—“মা ষষ্ঠী তোমার মঙ্গল করুন, তোমাকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করুন।”
বাঙালি সংস্কৃতিতে জামাইকে কেবল মেয়ের স্বামী হিসেবে নয়, বরং বংশপ্রদীপ বা বংশের রক্ষক হিসেবে দেখা হয়। লোকায়ত বিশ্বাস অনুযায়ী, জামাই দীর্ঘজীবী ও সুস্থ থাকলে তবেই তাঁর কন্যা সংসারী হবে এবং মাতৃত্বের স্বাদ পাবে। যেহেতু দেবী ষষ্ঠী হলেন সন্তান ও মাতৃত্বের দেবী, তাই জামাইয়ের দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনা করার অর্থ পরোক্ষভাবে নিজের মেয়ের এবং আগামী প্রজন্মের সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ কামনা করা।
আজকের এসি বা আধুনিক ইলেকট্রিক পাখার যুগেও জামাইষষ্ঠীর পুজোয় নতুন তালপাতার পাখা আবশ্যিক উপাদান। জ্যৈষ্ঠ মাস মানেই তীব্র গরম। প্রাচীনকালে যখন বিদ্যুৎ ছিল না, তখন অতিথি বা জামাইকে সমাদর করার প্রথম মাধ্যমই ছিল হাতপাখার শীতল হাওয়া। তাছাড়া, শাস্ত্র মতে নতুন তালপাতার পাখা শুভ ও শুদ্ধতার প্রতীক। এই পাখা দিয়ে হাওয়া করার অর্থ হল জামাইয়ের জীবন থেকে সমস্ত অলক্ষ্মী, ক্লান্তি এবং নেতিবাচক শক্তিকে দূরে ছুড়ে ফেলা।
পাখা দিয়ে হাওয়া করার পাশাপাশি শাশুড়িরা করমচা, আম, জামসহ পাঁচ ফল এবং আম্রপল্লব বা বাঁশপাতা সুতো দিয়ে বেঁধে জামাইয়ের মাথায় ছোঁয়ান। ধান যেমন সমৃদ্ধি ও উর্বরতার প্রতীক এবং দূর্বা যেমন শত প্রতিকূলতাতেও বেঁচে থাকার প্রতীক—তেমনই জামাইয়ের জীবনও যেন ধান-দূর্বার মতো ফলে-ফুলে এবং দীর্ঘায়ুতে ভরে ওঠে, সেই কামনাই করা হয়।
তাই কেবলই এক টুকরো লৌকিক আচার নয়, জামাইষষ্ঠীর এই ‘ষাট ষাট’ মন্ত্র আসলে জামাতার প্রতি শাশুড়ির মাতৃত্বসুলভ স্নেহ এবং তাঁর কল্যাণ কামনার এক পরম আন্তরিক বহিঃপ্রকাশ।