
জনপ্রিয় এক ডিমের বিজ্ঞাপনে, বার বার বলা হত, ‘সানডে হো ইয়া মানডে, রোজ খায়ে আন্ডে’। চিকিৎসকরা বলে থাকেন, রোজ অন্তত একটা করে ডিম খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে দারুণ উপকারি। তবে এই গল্পে ডিম খাওয়াটা একেবারে হটকে। নাহ, মুখ দিয়ে গিলে ফেলা নয়। বরং গায়ে লেগে সোজা মান-সম্মানে অ্য়াটাক! চোখের সামনেই হাজারো হাজারো লোকের সামনে আপনার সম্মান, একেবারে মাটিতে লুটোপুটি। প্রতিবাদের ইতিহাস ঘেঁটে দেখুন, যেখানে প্রতিবাদ, সেখানেই রয়েছে ডিম। যেখানেই রাজ-রাজার অত্যাচারে তীষ্ঠ হয়ে সাধারণ জনতা ধিক্কার জানিয়েছে রাজ্যপাটকে, তখনই ডিমের এন্ট্রি। কিন্তু জানেন কি, পৃথিবীর ইতিহাসে কে, কারা , ঠিক কোন সময়ে প্রথম ডিম ছুড়েছিল? ভাবছেন এ আবার কেমন গল্প? এটি গল্প হলেও, সত্যি বরং বলা ভালো রোমের ইতিহাসের এক প্রতিবাদী অধ্যায়। আসুন, একে একে ডিমের খোলস ছাড়িয়ে দেখা যাক।
জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেন কোনও প্রভাবশালী নেতা, আচমকাই শ্রোতাদের ভিড় থেকে উড়ে এল একটি পচা ডিম! বিশ্ব রাজনীতিতে এই দৃশ্য একেবারেই নতুন নয়। ক্ষোভ প্রকাশের ভাষা হিসেবে বা কোনও সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে যুগ যুগ ধরে মানুষ ব্যানার-ফেস্টুনের পাশাপাশি বেছে নিয়েছে রান্নাঘরের নানা উপাদানকে। যার মধ্যে ডিম হল সুপারহিট।
প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে খাবার ছুড়ে মারার ইতিহাস ঘাঁটলে প্রথমেই উঠে আসে প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের কথা। ইতিহাসবিদদের মতে, রোমান শাসনকালে সাধারণ মানুষ থিয়েটারে অভিনেতাদের খারাপ অভিনয় কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করতে ডিম ছুড়ে মারা হত।
পরবর্তীতে মধ্যযুগীয় ইউরোপে এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে অপরাধীদের যখন জনসমক্ষে কাঠের খাঁচায় বন্দি করে রাখা হত, তখন সাধারণ মানুষ তাদের দিকে পচা ডিম, কাদা ও পচা শাকসবজি ছুড়ে মারত। এটি কেবল শারীরিক আঘাত করার জন্য নয়, বরং অপরাধীকে সামাজিকভাবে চরম অপমানিত করার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হত। ইতিহাসে রয়েছে, ৬৩ খ্রীষ্টাব্দে রোমান গভর্নর ভেসপাসিয়ানের ওপর ক্ষুব্ধ জনতা ডিম ও টম্যাটো দুটো ছুড়ে মেরেছিল।
কিন্তু প্রতিবাদে ডিমই প্রথম পছন্দ কেন?
ইতিহাসবিদরা বলছেন, সেই সময় রোমান সাম্রাজ্যে প্রচুর খামার বাড়ি ছিল। সেই খামার বাড়িতেই ব্যবসার জন্য কিংবা নিজেদের খাওয়ার জন্যই মুরগি বা হাঁস পোষা হত। তাই ডিমের জোগানের অভাব ছিল না। আর সহজলভ্য ও জোগান থাকার কারণেই এই ডিম সহজ হাতিয়ার ছিল প্রতিবাদের।
ডিম গায়ে লাগলে হাড়গোড় ভাঙার ভয় থাকে না, কিন্তু তার তরল কুসুম এবং গন্ধ টার্গেট হওয়া ব্যক্তিকে মুহূর্তের মধ্যে জনসমক্ষে হাসির পাত্র বানিয়ে ছাড়ে।
আমেরিকার ইতিহাসে ১৮৭০ সালের একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে নিউ ইয়র্কের একটি থিয়েটারে এক অভিনেতার জঘন্য পারফরম্যান্সের প্রতিবাদে দর্শকরা পচা ডিম বর্ষণ করা হয়েছিল।
তবে শুধুই রোমের ইতিহাসে নয়, যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ডিম ছুড়ে মারাটা যেন এক অঘোষিত ঐতিহ্য। প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী জন মেজরের গায়ে ১৯৯২ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ডিম ছুড়ে মারা হয়েছিল। বাদ যাননি সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকটও; ২০০১ সালে তাঁর দিকে ডিম ছুড়ে মারা হলে তিনি পাল্টা ঘুসি চালিয়ে বসেন, যা ব্রিটিশ রাজনৈতিক ইতিহাসে এক তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এরপর রাজা তৃতীয় চার্লস থেকে শুরু করে উগ্র ডানপন্থী নেতা নিউজিল্যান্ডের ফ্রেজার অ্যানিং—সবার দিকেই ক্ষুব্ধ জনতা বা ডিম্বধারী আন্দোলনকারীরা ডিম ছুড়ে নিজেদের ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। এই তালিকার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে শনিবার তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গায়ে ডিম ছোড়ার ঘটনাও।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রতিবাদের এই ‘মেনু’তে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন খাবার। ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যে ব্রেক্সিট পার্টির নেতা নাইজেল ফারাজের গায়ে ছুড়ে মারা হয় ‘ফাইভ গাইজ’ ব্র্যান্ডের একটি আস্ত মিল্কশেক। এরপর থেকেই ‘মিল্কশেকিং’ (Milkshaking) বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন ধরনের অহিংস কিন্তু চরম অপমানজনক প্রতিবাদ হিসেবে পরিচিতি পায়।
একইভাবে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশ্যে উড়ে এসেছে ডিম, স্যান্ডউইচ বা জুতোও। এই ধরনের প্রতিবাদের মূল উদ্দেশ্য হল—শাসক বা প্রভাবশালী ব্যক্তির ক্ষমতা ও গাম্ভীর্যের যে ‘বুদবুদ’, তাকে এক নিমেষে চূর্ণ করে দেওয়া।