
বর্তমান সময়ে ডায়াবিটিসের মতোই ঘরে ঘরে থাইরয়েডের সমস্যা। বয়সের বাছবিচার নেই— ছোট থেকে বড়, প্রায় সকলেই কম-বেশি এই হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছেন। থাইরক্সিন হরমোনের ভারসাম্য বিগড়ে গেলেই শরীরে ক্লান্তি, অকারণে ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস, ঋতুচক্রে অনিয়ম— এমন হাজারো সমস্যা দানা বাঁধে। তবে থাইরয়েড নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে থাকা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিড়ে প্রকৃত চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে তৈরি হচ্ছে ধোঁয়াশা।
অনেক সময় নেটপ্রভাবীরা দাবি করেন, শুধুমাত্র বিশেষ ডায়েট, ভেষজ পানীয় বা যোগাভ্যাস করলেই থাইরয়েড পুরোপুরি সেরে যাবে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলছে?
মুম্বইয়ের প্রখ্যাত চিকিৎসকরা এই বিষয়ে বেশ স্পষ্ট মতামত দিয়েছেন। চিকিৎসক নীমিত নাগড়া-র মতে, “থাইরয়েডজনিত সমস্যা সাধারণত নিজে থেকে সারে না। হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করতে ওষুধের প্রয়োজন হয়। চিকিৎসায় গাফিলতি করলে এই সমস্যা ভবিষ্যতে জটিল আকার ধারণ করতে পারে।”
অন্যদিকে, ডায়াবিটিস বিশেষজ্ঞ আরতি উল্লালের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কেবল টোটকা বা জীবনযাত্রার পরিবর্তন দিয়ে থাইরয়েড সারানো সম্ভব নয়। চিকিৎসা ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
ডায়েট ও জীবনযাত্রার ভূমিকা ঠিক কতটা?
অনেকেই মনে করেন, ওষুধ না খেয়ে ডায়েট কন্ট্রোল করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে। চিকিৎসকদের মতে:
ওষুধই প্রধান: জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা ঠিক রাখতে অবশ্যই সাহায্য করে, তবে তা ওষুধের পরিপূরক হতে পারে, বিকল্প নয়।
সাময়িক উপশম: দীর্ঘমেয়াদী শারীরচর্চা বা ডায়েট মেনে চললে অনেক সময় হরমোনের মাত্রা সাময়িক স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ডিটক্স পানীয়, ভেষজ সাপ্লিমেন্ট বা টোটকা খেয়ে হরমোনের ওঠাপড়া নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। উল্টে ভুল কিছু খেলে শারীরিক জটিলতা আরও বাড়তে পারে।
সব ক্ষেত্রে যে দীর্ঘস্থায়ী ওষুধের প্রয়োজন পড়ে, তা কিন্তু নয়। কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে থাইরয়েডের মাত্রা স্বাভাবিক হতে পারে:
অন্তঃসত্ত্বা অবস্থা: গর্ভাবস্থায় হরমোনের হেরফের হলেও, প্রসবের পর অনেক সময় তা প্রাকৃতিকভাবেই স্বাভাবিক হয়ে যায়।
বিশেষ কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা থাইরয়েড গ্রন্থিতে আচমকা প্রদাহের কারণে সাময়িক ওঠানামা হতে পারে। মূল কারণটি নির্মূল হলে থাইরয়েডের সমস্যাও বিদায় নেয়।
টিএসএইচ (TSH) মাত্রা: টিএসএইচ-এর মাত্রা খুব সামান্য বাড়লে এবং শরীরে কোনো উপসর্গ না থাকলে, দীর্ঘমেয়াদী ওষুধ ছাড়াই কেবল জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা।
থাইরয়েডের সমস্যা অবহেলা করার মতো নয়। ঘরোয়া টোটকা বা ইন্টারনেট দেখে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সঠিক চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় জীবনযাত্রার সমন্বয়েই এই অসুখ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। মনে রাখবেন, গুগল বা ফেসবুকের চেয়ে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনই আপনার স্বাস্থ্যের জন্য একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায়।