
বর্তমান সময়ে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে বাড়ছে ডায়াবেটিসের সমস্যা। অনেক সময়ই মানুষ রক্তে শর্করার (ব্লাড সুগার) বর্ধিত মাত্রাকে সাধারণ বা সাধারণ ক্লান্তি ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত ব্লাড সুগার শরীরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি করে দিতে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় এর লক্ষণগুলো খুব একটা স্পষ্ট হয় না বলেই বেশির ভাগ মানুষ সঠিক সময়ে পরীক্ষা করান না, যা বিপদ আরও বাড়িয়ে তোলে।
অনিয়মিত ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। অনেকেই নিয়মিত সুগার পরীক্ষা বা ডাক্তারের পরামর্শ মেনে ওষুধ খাওয়া অবহেলা করেন। এর ফলে ভবিষ্যতে কী ধরনের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং শরীরকে সুস্থ রাখতে কোন কোন বিষয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি, তা নিচে আলোচনা করা হল।
‘আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন’-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা অস্বাভাবিক রকমের বেশি থাকলে তা শরীরের রক্তনালীগুলোর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এর ফলে মূলত ৪টি অঙ্গ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে-
অনিয়ন্ত্রিত সুগার সরাসরি হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। রক্তে বাড়তি শর্করার কারণে কিডনির ফিল্টার করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে, যা পরবর্তী সময়ে কিডনি বিকল (Kidney Failure) হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
হাই ব্লাড সুগারের ফলে চোখের রেটিনার রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর থেকে ‘ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি’ হতে পারে, যা মানুষকে চিরতরে অন্ধ করে দিতে পারে।
বিশেষ করে হাত ও পায়ের স্নায়ুগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে পায়ে রক্ত সঞ্চালন কমে যায়, অবশ ভাব তৈরি হয় এবং সামান্য ক্ষত থেকেও বড় ধরনের ইনফেকশন বা গ্যাংগ্রিন হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কোন কোন লক্ষণ দেখলে অবিলম্বে সুগার পরীক্ষা করা উচিত?
শরীরে ব্লাড সুগারের মাত্রা বাড়তে শুরু করলে কিছু প্রাথমিক উপসর্গ দেখা দেয়, যা খেয়াল রাখা জরুরি-
ঘন ঘন তীব্র তৃষ্ণা পাওয়া এবং অল্পতেই ক্লান্ত বোধ করা।
স্বাভাবিকের চেয়ে বারবার প্রস্রাবের বেগ হওয়া (বিশেষ করে রাতে)।
কোনও ডায়েট বা ব্যায়াম ছাড়াই আচমকা শরীরের ওজন দ্রুত কমে যাওয়া।
দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসা।
শরীরের কোথাও কেটে বা ছড়ে গেলে সেই ক্ষত শুকোতে দীর্ঘ সময় লাগা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যাঁদের পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে কিংবা যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ (High BP) এবং স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের কোনো লক্ষণ না থাকলেও নিয়মিত বিরতিতে রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করানো উচিত।
ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে কী করবেন?
সামান্য কিছু সচেতনতা এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে ডায়াবেটিসকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব:
১.খাবারে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কমিয়ে ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার বাড়াতে হবে। মিষ্টি, কোল্ড ড্রিংকস এবং প্রক্রিয়াজাত বা ফাস্ট ফুড খাওয়া একেবারেই বর্জন করা উচিত।
২.প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট নিয়ম করে হাঁটুন বা হালকা ব্যায়াম করুন। এটি শরীরের ইনসুলিন হরমোনের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।
৩. চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ব্লাড সুগার পরীক্ষা করুন এবং প্রেসক্রিপশন মেনে ওষুধ বা ইনসুলিন নিন। নিজে থেকে কখনও ওষুধ বন্ধ করবেন না।
৪.প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম অত্যন্ত জরুরি। সেই সঙ্গে ইয়োগা বা মেডিটেশনের মাধ্যমে মানসিক চাপ (Stress) নিয়ন্ত্রণে রাখুন, কারণ অতিরিক্ত মানসিক চাপও রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।