
বসন্তের বিদায় আর গরমের শুরুতে, চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষ অষ্টমী তিথিতে ঘরে ঘরে মা অন্নপূর্ণার আরাধনা করা হয়। কিন্তু কে এই অন্নপূর্ণা দেবী? তাঁর পৌরাণিক গল্পের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে কোন গভীর জীবনদর্শন ?
দেবী অন্নপূর্ণা হলেন আসলে স্বয়ং আদিশক্তি বা পার্বতীরই একটি বিশেষ রূপ। ‘অন্ন’ মানে খাদ্য আর ‘পূর্ণা’ মানে যা ভরপুর। অর্থাৎ, যিনি পরম যত্নে গোটা সৃষ্টির খিদের অন্ন জোগাতেন।
এই দেবীর আবির্ভাবের পেছনে রয়েছে এক দারুণ গল্প। লোকগাথা অনুযায়ী, একবার দেবরাজ মহাদেব ও পার্বতীর মধ্যে এক তুমুল তর্ক বেঁধেছিল। শিব দাবি করলেন, এই বস্তুগত পৃথিবী—টাকা-পয়সা, ঘরবাড়ি, এমনকি যে খাবার আমরা খাই, তার সবকিছুই আসলে একটা ‘মায়া’ বা বিভ্রম। পরম সত্য কেবল আধ্যাত্মিকতা।
এই কথায় দেবী পার্বতী একটু ক্ষুণ্ণই হলেন। তিনি মহাদেবকে বোঝাতে চাইলেন যে, আধ্যাত্মিকতার সাধনা করতে গেলেও শরীরকে টিকিয়ে রাখতে হয়, আর তার জন্য খাবারের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করতে তিনি পৃথিবী থেকে হঠাৎ অন্তর্ধিত হয়ে গেলেন।
ফলাফল যা হওয়ার তাই হল! গোটা পৃথিবী জুড়ে দেখা দিল তীব্র হাহাকার, খরা আর দুর্ভিক্ষ। খেত-খামার শুকিয়ে গেল, মানুষ ও পশুপাখি অন্নের অভাবে ছটফট করতে লাগল। এমনকী, স্বয়ং মহাদেব এবং তাঁর অনুচরেরাও ক্ষুধার জ্বালায় অস্থির হয়ে উঠলেন। মহাদেব বুঝতে পারলেন, বস্তুগত জগতকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে জীবন চলতে পারে না।
ক্ষুধার্ত শিব যখন ব্যাকুল হয়ে খাবার খুঁজছেন, তখন তিনি শুনতে পেলেন কাশীতে এক দয়াময়ী নারী পরম যত্নে সবাইকে অন্নদান করছেন। শিব সেখানে ছুটে গিয়ে দেখলেন, স্বয়ং পার্বতী দেবী অন্নপূর্ণা রূপ ধারণ করে সোনার পাত্র আর হাতা হাতে বসে আছেন। নিজের ভুল স্বীকার করে মহাদেব তখন দেবীর কাছে অন্ন ভিক্ষা করলেন। দেবীও হাসিমুখে তাঁর স্বামীকে আহার করিয়ে তৃপ্ত করলেন এবং পৃথিবীর দুর্ভিক্ষ দূর হলো। এভাবেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল মাহাত্ম্য। এখনও বেনারসে অন্নপূর্ণা মন্দিরে কেউ অভুক্ত থাকেন না।