
সনাতন ধর্মে ১৮টি মহাপুরাণের মধ্যে ‘গরুড় পুরাণ’-এর স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনন্য। এই পবিত্র গ্রন্থে মানুষের জন্ম, মৃত্যু এবং মৃত্যুর পর শুরু হওয়া এক অদৃশ্য জগতের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি মানুষই জীবনে কখনও না কখনও ভাবেন— মৃত্যুর পর শরীর থেকে বের হয়ে আত্মা কীভাবে এবং কতদিনে যমলোকে পৌঁছায়? সেই অচিন দেশের পথটাই বা কতখানি দীর্ঘ? গরুড় পুরাণের রয়েছে তাঁর বিস্তারিত বর্ণনা।
গরুড় পুরাণ অনুযায়ী, মৃত্যুর পরপরই আত্মা সরাসরি যমরাজের দরবারে গিয়ে পৌঁছয় না। সেখানে পৌঁছানোর জন্য আত্মাকে এক দীর্ঘ, ক্লান্তিকর এবং অত্যন্ত কঠিন পথ অতিক্রম করতে হয়। এই সম্পূর্ণ পথটি পাড়ি দিতে আত্মার সময় লাগে প্রায় ৪৭ দিন। প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই যমরাজের দুই দূত (যমদূত) তাঁর আত্মাকে নিতে মর্ত্যে আসেন।
যমদূতরা প্রথমে মৃত ব্যক্তির আত্মাকে যমলোকে নিয়ে যান এবং সেখানে মাত্র ২৪ ঘণ্টা রাখা হয়। এই ২৪ ঘণ্টায় আত্মাকে তাঁর ইহজীবনের সমস্ত ভালো ও মন্দ কাজের একটি খতিয়ান বা ঝলক দেখানো হয়। কর্মের সেই হিসাব-নিকাশ দেখানোর পর, যমদূতরা আত্মাকে আবার ঠিক সেই বাড়িতেই এনে ছেড়ে দেন, যেখানে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। এরপর টানা ১৩ দিন পর্যন্ত সেই আত্মা নিজের ঘর এবং পরিবারের সদস্যদের মাঝেই ঘুরে বেড়ায়।
হিন্দু ধর্মে মৃত্যুর পর ১৩ দিন ধরে পিণ্ডদান এবং শ্রাদ্ধের আচার পালন করার পেছনে একটি গভীর কারণ রয়েছে। মনে করা হয়, এই পিণ্ডদান থেকে প্রাপ্ত অন্ন ও জলের শক্তি নিয়েই আত্মা যমলোকের উদ্দেশ্যে তাঁর মূল সফর শুরু করতে পারে। শ্রাদ্ধের পর অর্থাৎ তেরো দিনের দিন আত্মার আসল এবং অত্যন্ত ভয়ানক যাত্রা শুরু হয়। গরুড় পুরাণ অনুসারে, যমলোকে যাওয়ার এই রাস্তাটি প্রায় ৮৬ হাজার যোজন দীর্ঘ। এই পথটি গা ছমছমে ঘন জঙ্গল দিয়ে ঘেরা।
যমলোকের এই দুর্গম পথে চলার সময় আত্মা কোথাও জিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায় না, এমনকি তেষ্টা মেটানোর জন্য এক ফোঁটা জলও মেলে না। যমদূতরা আত্মাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে সামনের দিকে নিয়ে যায়। খিদে ও তেষ্টায় ব্যাকুল হয়ে ছটফট করতে থাকা আত্মার একমাত্র শক্তির উৎস হয়ে ওঠে মর্ত্যে স্বজনদের দেওয়া সেই পিণ্ডদান।
এই যাত্রাপথের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অংশ হল ‘বৈতরণী নদী’। এই নদীতে জলের বদলে বয়ে চলে ঘন রক্ত, পুঁজ, হাড় এবং পচা মাংস। পাপী আত্মারা এই নদীর রূপ দেখেই ভয়ে কাঁপতে শুরু করে এবং যমদূতদের হাতে অশেষ যন্ত্রণা পায়। অন্যদিকে, পুণ্যবান আত্মারা অতি সহজেই এই নদী পার হয়ে যান। এইভাবেই খিদে, তেষ্টা এবং নানাবিধ যাতনা সহ্য করে, দীর্ঘ ৪৭ দিনের এক হাড়হিম করা যাত্রা শেষে আত্মা অবশেষে যমরাজের মূল দরবারে গিয়ে উপস্থিত হয়। সেখানেই নির্ধারিত হয় আত্মার পরবর্তী ভাগ্য।
এই খবরের তথ্যসমূহ ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সাধারণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। টিভি৯ বাংলা (TV9Bangla) এর সত্যতা নিশ্চিত করে না।