
সনাতন ধর্মে দৈনিক পুজো-আচ্চা ও ধর্মাচরণের একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কম-বেশি আমরা প্রত্যেকেই প্রতিদিন ঘরের মন্দিরে ঈশ্বরের আরাধনা করে থাকি। তবে পুজো করার সময় প্রায়শই আমাদের মনে একটি দ্বন্দ্ব বা দ্বিধা তৈরি হয়— ঈশ্বরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করা উচিত নাকি বসে? অনেক সময় তাড়া থাকার কারণে আমরা তড়িঘড়ি দাঁড়িয়েই হাত জোড় করে নিই, আবার কখনও সময় থাকলে আরাম করে আসন পেতে বসি। কিন্তু আপনি কি জানেন যে, শাস্ত্রে এবং পুরাণে পুজো করার নির্দিষ্ট কিছু নিয়মের উল্লেখ রয়েছে? শাস্ত্র অনুযায়ী পুজো করার সঠিক নিয়মটি আসলে কী, আসুন জেনে নেওয়া যাক।
ধর্মীয় বিশ্বাস এবং শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী, ঈশ্বরের নিত্যদিনের পুজো সবসময় আসনে বসে করাটাই সবচেয়ে শ্রেয়। পুজো করার সময় সরাসরি মেঝে বা মাটিতে না বসে সুতির কাপড়, কুশাসন কিংবা কম্বলের আসন পাতার নিয়ম রয়েছে। মনে করা হয়, আসনে বসে পুজো করলে মন ও শরীর দুই-ই স্থির থাকে। এই কারণেই দৈনিক পুজো, মন্ত্র জপ, ধ্যান এবং পাঠ করার সময় সবসময় বসে আরাধনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কোন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে পুজো করা যায়?
তার মানে এই নয় যে দাঁড়িয়ে পুজো করা ভুল বা নিষিদ্ধ। অনেক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে পুজো করাটাও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। মন্দিরে আরতির সময়, ঈশ্বরের দর্শনের মুহূর্তে, ধূপ-দীপ দেখানোর সময় কিংবা বিশেষ কোনও যজ্ঞ-অনুষ্ঠানে ভক্তরা দাঁড়িয়েই পুজো সম্পন্ন করেন। এছাড়া যদি কোনও স্থানে বসার জায়গা না থাকে বা অতিরিক্ত ভিড় থাকে, তবে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরকে স্মরণ বা প্রার্থনা করায় কোনও বাধা নেই।
পুজোয় সঠিক আসনের গুরুত্ব কতটা?
ধর্মগ্রন্থে পুজো করার সময় সঠিক আসনের ব্যবহারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, উপযুক্ত আসনে বসলে শরীরের শক্তি ও ইতিবাচক শক্তির ভারসাম্য বজায় থাকে। এর ফলে মন এদিক-ওদিক না চটে সরাসরি ঈশ্বরের ভক্তিতে নিবিষ্ট হতে পারে। এই কারণেই প্রাচীনকাল থেকে সাধু-সন্ত এবং ঋষি-মুনিরা সাধনার সময় বিশেষ আসনের ব্যবহার করতেন।
বয়স্ক বা অসুস্থ ব্যক্তিরা কি দাঁড়িয়ে পুজো করতে পারেন?
যদি কোনও ব্যক্তির মাটিতে বসতে সমস্যা হয় কিংবা তিনি বয়স্ক বা শারীরিকভবে অসুস্থ হন, তবে তিনি নিজের সুবিধামতো দাঁড়িয়ে কিংবা চেয়ারে বসেও ঈশ্বরের আরাধনা করতে পারেন। ধর্মীয় বিশ্বাস বলে, ভগবান বাইরের আড়ম্বর বা নিয়মের চেয়ে ভক্তের অন্তরের ভক্তি, শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠাকেই বেশি প্রাধান্য দেন। তাই স্বাস্থ্যগত কারণে পুজোর পদ্ধতিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা মোটেও ভুল নয়।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে পুজোর মূল উদ্দেশ্য হল ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং আত্মসমর্পণ প্রকাশ করা। মন যদি চঞ্চল থাকে এবং এদিক-ওদিক ঘোরে, তবে কেবল নিয়ম রক্ষার খাতিরে পুজো করলে তার পূর্ণ ফল মেলে না। অন্যদিকে, যান্ত্রিক নিয়ম না মেনেও যদি পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন মনে ঈশ্বরের কাছে ছোট্ট একটি প্রার্থনাও করা যায়, তবে তাও অত্যন্ত ফলদায়ী বলে গণ্য হয়।