
ধর্মীয় বিশ্বাসে গঙ্গাজলকে বলা হয় ‘অমৃত’। সনাতন সংস্কৃতিতে পূজা-পার্বণ থেকে শুরু করে আত্মশুদ্ধি— গঙ্গাজল ছাড়া সবটাই যেন অসম্পূর্ণ। কিন্তু সাধারণ জল পাত্রে কয়েকদিন রেখে দিলেই যেখানে দুর্গন্ধ বেরোয়, ব্যাকটেরিয়া জন্মায় এবং তা পচে যায়; সেখানে বছরের পর বছর বোতলবন্দি করে রাখার পরও গঙ্গাজল কেন সম্পূর্ণ দুর্গন্ধহীন ও বিশুদ্ধ থাকে?
অনেকে একে স্রেফ অন্ধবিশ্বাস বলে উড়িয়ে দিলেও, ইতিহাস ও আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণায় উঠে এসেছে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন সত্য। হিমালয়ের গোমুখ থেকে শুরু করে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত প্রায় ২,৫২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা এই নদীর জলের ‘স্বয়ংক্রিয় বিশুদ্ধকরণ’ (Self-purifying capacity) ক্ষমতা বিশ্বজুড়ে গবেষকদের শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাজ্জব করে রেখেছে।
পুরাণে রাজা ভগীরথের তপস্যায় গঙ্গার মর্ত্যে আগমন এবং দেবতাদের স্পর্শের যে বর্ণনা আছে, তার প্রভাব ছিল মোগল সাম্রাজ্যেও। ১৬ শতকে আবুল ফজল তাঁর ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে লিখেছিলেন— সম্রাট আকবর গঙ্গাজলকে বলতেন ‘Water of Immortality’ (অমরত্বের জল)। আকবর আগ্রা বা ফতেহপুর সিক্রিতে থাকলে গঙ্গার বিশেষ অঞ্চল থেকে এবং পাঞ্জাবে থাকলে হরিদ্বার থেকে পাহারাদারদের মাধ্যমে সিল করা পাত্রে গঙ্গাজল আনিয়ে পান করতেন। কারণ চারশো বছর আগেও মানুষ জানত, এই জল দীর্ঘদিন রাখলেও এর স্বাদ ও গুণমান নষ্ট হয় না।
গঙ্গাজলের জীবাণুনাশক ক্ষমতা নিয়ে প্রথম ঐতিহাসিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাটি করেছিলেন ব্রিটিশ ব্যাকটেরিওলজিস্ট আর্নেস্ট হানবুড়ি হানকিন (Ernest Hanbury Hankin)। ১৮৯০-এর দশকে ভারতে যখন কলেরার মড়ক দেখা যায়, তখন প্রয়াগরাজের মাঘ মেলায় বহু মানুষের মৃত্যু হয় এবং গঙ্গার জলে মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়। সত্ত্বেও দেখা যায় গঙ্গার জল ব্যবহারকারীদের অনেকে নিরাপদ ছিলেন।
১৮৯৬ সালে প্রকাশিত তাঁর গবেষণাপত্রে হানকিন জানান, কুয়োর জলে কলেরার মারাত্মক জীবাণু Vibrio cholerae দ্রুত বংশবৃদ্ধি করলেও, গঙ্গার জলে সেই জীবাণু ঢাললে মাত্র তিন ঘণ্টারও কম সময়ে তা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়!
পরবর্তীকালে ফরাসি বিজ্ঞানী ফেলিক্স ডেল ডেরেল (Félix d’Hérelle) আবিষ্কার করেন এমন এক বিশেষ ধরনের ‘বান্ধব ভাইরাস’, যা মানুষকে ক্ষতি না করে কেবল ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ভক্ষণ করে মেরে ফেলে। তিনি নাম দেন ‘ব্যাকটেরিওফেজ’ (Bacteriophage)। নিজের বিখ্যাত বইয়ে ডেরেল স্পষ্ট উল্লেখ করেন, হানকিন গঙ্গাজলে যে অজানা ব্যাকটেরিয়ায় সন্ধান পেয়েছিলেন, তা আসলে এই ব্যাকটেরিওফেজ। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গঙ্গাজলে প্রায় ১,০০০ প্রজাতির ব্যাকটেরিওফেজ রয়েছে।
আধুনিক গবেষণা কী বলছে?
২০১১ সালে স্টিফেন টি অ্যাভেডন এবং সম্প্রতি ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক জার্নাল Environmental Monitoring and Assessment-এ প্রকাশিত CSIR-National Botanical Research Institute (NBRI)-এর বিজ্ঞানী সঞ্জয় দ্বিবেদী, পুনিত সিং চৌহানদের এক যৌথ গবেষণায় মহাকুম্ভের সময় গঙ্গাজলের গুণমান পরীক্ষা করা হয়। সেই গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্যান্য নদীর (যেমন যমুনা বা নর্মদা) তুলনায় গঙ্গাজলে ব্যাকটেরিওফেজ এবং খনিজ সালফারের পরিমাণ অনেক বেশি। গঙ্গাজল বায়ুমণ্ডল থেকে অত্যন্ত দ্রুত অক্সিজেন শুষে নিতে পারে। সাধারণ নদীর তুলনায় এর পলি ও জল ২০ গুণ বেশি পচনশীল বর্জ্য বা ময়লা নিজে থেকেই প্রক্রিয়াজাত করে ফেলতে পারে। হিমালয়ের ওষুধী গুণসম্পন্ন ভেষজ উদ্ভিদ ও পাথরের সংস্পর্শে এসে গঙ্গাজলে যে খনিজ এবং ব্যাকটেরিওফেজ তৈরি হয়, তা-ই মূলত ক্ষতিকারক জীবাণুর বংশবৃদ্ধি রুখে দেয়।