
আজ জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা। পুরীর শ্রী জগन्नाथ মন্দিরে আজ মহাসমারোহে পালিত হল পবিত্র ‘দেবস্নান পূর্ণিমা’। শাস্ত্রীয় নিয়ম মেনে বছরের এই একটি দিনেই গর্ভগৃহ থেকে বাইরে এনে মহাপ্রভু জগন্নাথ, বড় ভাই বলভদ্র এবং বোন সুভদ্রাকে ১০৮টি পবিত্র কলসের সুবাসিত জল দিয়ে মহাশোধন বা মহাস্নান করানো হয়। বিশ্বপ্রসিদ্ধ জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার সূচনা পর্বের এটিই প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাজকীয় স্নানের ধকল সইতে না পেরে মহাপ্রভু সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েন এবং আগামী ১৫ দিনের জন্য ‘অনসর’ বা একান্তে চলে যান। এই সময়ে ভক্তরা ঈশ্বরের দর্শন পান না। আসুন জেনে নেওয়া যাক দেবস্নান পূর্ণিমার এই অলৌকিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় গুরুত্ব এবং এর পেছনের কিছু অজানা কথা।
জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমার এই তিথিটিকে ভগবান জগন্নাথের বার্ষিক অভিষেকের দিন হিসেবে গণ্য করা হয়। এই বিশেষ উপলক্ষে জগন্নাথ, বলভদ্র এবং দেবী সুভদ্রাকে মন্দির চত্বরের এক বিশেষ স্নান মণ্ডপে এনে অধিষ্ঠিত করা হয়। এরপর বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে ১০৮টি পবিত্র ঘড়ার জল দিয়ে তাঁদের শাহী স্নান সম্পন্ন হয়। মনে করা হয়, এই মহা-অভিষেকের মাধ্যমেই বিশ্বখ্যাত রথযাত্রা উৎসবের আনুষ্ঠানিক ও ধর্মীয় প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।
হিন্দু ধর্মে ‘১০৮’ সংখ্যাটিকে অত্যন্ত পবিত্র ও শুভ বলে মনে করা হয়। জপমালার ১০৮টি পুঁতি হোক, ১০৮টি উপনিষদ বা ঈশ্বরের ১০৮টি দিব্য নাম— এই সংখ্যার একটি গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে। আর সেই কারণেই জগন্নাথ দেবের অভিষেকেও ১০৮টি কলস ব্যবহার করা হয়। এই কলসগুলিতে যে জল ভরা হয়, তা আনা হয় মন্দির চত্বরের উত্তর দিকে অবস্থিত একটি বিশেষ ‘সোনার কুয়ো’ থেকে। নিয়ম অনুযায়ী, এই কুয়োটি সারা বছর বন্ধ থাকে এবং কেবল দেবস্নান পূর্ণিমার দিনেই তা খোলা হয়।
কেন একে ‘সোনার কুয়ো’ বলা হয়?
পৌরাণিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই বিশেষ কুয়োটি নির্মাণ করিয়েছিলেন পরম বৈষ্ণব রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন। কথিত আছে, এই কুয়োটি খনন ও নির্মাণের সময় সোনার শিকল ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই কারণেই লোকমুখে এটি ‘সোনার কুয়ো’ নামে পরিচিত। প্রায় ৪ থেকে ৫ মিটার গভীর এই কুয়ো থেকে বিশেষ বিধি মেনে ১৫ থেকে ১৭ জন সেবাইত ১০৮টি কলসে জল তোলেন। এরপর মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে শ্রীবিগ্রহের অভিষেক সম্পন্ন হয়।
স্নানের পর কেন ‘অসুস্থ’ হন মহাপ্রভু?
দেবস্নান পূর্ণিমার সবচেয়ে অনন্য এবং প্রাচীন ঐতিহ্য হল মহাস্টানের পর জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার ‘জ্বর’ আসা। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, টানা বেশ কিছুক্ষণ ধরে সুশীতল ও ঔষধি জল দিয়ে স্নান করার কারণে ভগবান অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর এই অসুস্থতার কারণেই তিনি আগামী ১৫ দিন সম্পূর্ণ বিশ্রামে বা একাকীত্বে থাকেন। এই সময়ে সাধারণ ভক্তদের জন্য মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে। এই ১৫ দিন কেবল রাজবৈদ্য ও বিশেষ সেবাইতরা প্রভুর সেবা, ভেষজ চিকিৎসা এবং গোপন পূজার্চনা করেন।
মহাস্নানের পর শুরু হওয়া এই ১৫ দিনের সময়কালকে শাস্ত্রে ‘অনসর কাল’ বা ‘অণসর’ বলা হয়। এই সময় ভগবান ভক্তদের দর্শন দেন না। লোকমান্যতা অনুযায়ী, কোনও অসুস্থ মানুষের যেভাবে যত্ন নেওয়া হয়, ঠিক সেভাবেই এই দিনগুলিতে ভগবানেরও বিশেষ সেবা ও পথ্য প্রদান করা হয়। এরপর প্রভু যখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন, তখন ‘নবধৌবন বেশে’ তিনি পুনরায় ভক্তদের দর্শন দেন। আর তারপরেই মহাসমারোহে শুরু হয় রথযাত্রা।
দেবস্নান পূর্ণিমার পর মহাপ্রভু ১৫ দিন বিশ্রামে থাকবেন। এরপর সুস্থ হয়ে নবযৌবন রূপ দেওয়ার পর, আগামী ১৬ জুলাই ২০২৬ থেকে বিশ্বপ্রসিদ্ধ জগন্নাথ রথযাত্রার শুভ সূচনা হবে। এই পুণ্য রথযাত্রা চলবে ২৪ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত। উৎসবের দিনগুলিতে মহাপ্রভুর নগর পরিক্রমা ও দর্শন পাওয়ার জন্য দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম ঘটবে ওড়িশার সৈকত শহর পুরীতে।