
মালদহ: তিনি এ বছর ‘বিদ্যাসাগর শিক্ষক সম্মান’ পেয়েছেন। যে স্কুলের তিনি প্রধান শিক্ষক, সেই স্কুলে একসময় ৯০-৯৫ জন পড়ুয়া ছিল। তিনি প্রধান শিক্ষক হওয়ার পর তা বেড়ে এখন আড়াইশো পেরিয়েছে। গর্বের সঙ্গে সেকথা শোনাচ্ছিলেন। কিন্তু, যাঁর নামে তিনি সম্মান পেলেন, সেই বিদ্যাসাগর সম্পর্কে দু-চার কথা জানতে চাওয়াতেই গর্বে ভরা মুখ আচমকা বিবর্ণ হয়ে গেল। তারপর যা হল, তা বোধহয় সাংবাদিকও ভাবতে পারেননি। বিদ্যাসাগরের পদবী জানেন না প্রধান শিক্ষক। সহজপাঠের লেখকের নামও বদলে দিলেন। এমনকি, ব্ল্যাকবোর্ডে বিদ্যাসাগর বানানও ভুল লিখলেন। এই ছবিই ধরা পড়ল মালদহের এক প্রাথমিক স্কুলে।
মালদা থানা এলাকার কাদিরপুর। সেখানকার কাদিরপুর কিরণময়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হলেন তনয় মিশ্র। সম্প্রতি তিনি বিদ্যাসাগর শিক্ষক সম্মান পেয়েছেন। তিনি তৃণমূলের শিক্ষক সংগঠনের সক্রিয় সদস্য। পদেও ছিলেন। জেলার একাধিক তৃণমূল নেতার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বলে জানা গিয়েছে।
এদিন টিভি৯ বাংলার প্রতিনিধি পৌঁছে যান ওই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তড়িঘড়ি পড়ুয়াদের প্রার্থনার লাইনে দাঁড় করানো হয়। এরপর দেখা যায়, প্রধান শিক্ষক তনয় মিশ্র পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস নিচ্ছেন। অনুমতি নিয়ে সেই ক্লাসে ঢোকেন টিভি৯ বাংলার প্রতিনিধি। সেখানেই প্রথমে গর্বের সঙ্গে প্রধান শিক্ষক জানান, ২০১৫ সালে এই স্কুলে এসেছেন তিনি। সেইসময় স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা একশোও ছিল না। এখন তা আড়াইশো ছাড়িয়েছে।
তিনি বিদ্যাসাগর শিক্ষক সম্মান পাওয়ায় তাঁকে ধন্যবাদ জানানোর পর বিদ্যাসাগর সম্পর্কে দু-চার কথা বলতে বলা হয়। তখন তিনি ব্ল্যাকবোর্ডে বিদ্যাসাগর লেখেন। সেখানে দেখা যায়, ‘বিদ্যাসগর’ লিখেছেন। এরপর তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়, বিদ্যাসাগরের পুরো নাম কী? তিনি বলেন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। পদবী জানতে চাওয়ায় প্রধান শিক্ষক থতমত খেয়ে যান। অনেক চেষ্টা করেও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পদবী যে বন্দ্যোপাধ্যায়, তা মনে করতে পারেননি। বিদ্যাসাগরের জন্মস্থান জানতে চাওয়ায় প্রথমে মেদিনীপুর বলেন। তারপর বলেন, ‘বর্ধমান মনে হয়।’
অস্বস্তির এখানেই শেষ হয়নি। বিদ্যাসাগরের ছোটদের জন্য দু-একটি লেখার কথা জানতে চাইলে তিনি বর্ণপরিচয় ও সহজপাঠের কথা উল্লেখ করেন। তাঁকে একাধিকবার জিজ্ঞাসা করা হয়, সহজপাঠ বিদ্যাসাগরের লেখা? তখনও তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম মনে করতে পারেননি। বলেন, সহজপাঠ বিদ্যাসাগরের লেখা। সহজপাঠে কী রয়েছে, তাও বলতে পারলেন না। শেষে সাংবাদিকের আরও কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে না চেয়ে সরে যান।
বিস্ময়ের তখনও বাকি ছিল। স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির অধিকাংশ পড়ুয়াই বিদ্যাসাগর সম্পর্কে কিছুই জানে না। কেউ বলল, বিদ্যাসাগরের পদবী মণ্ডল। বন্দেমাতরম কার লেখা জানে না। সমস্ত প্রাথমিক স্কুলে শিশু বিকাশ ও শিশু মনস্তত্ত্ব শিক্ষকদের জানা বাধ্যতামূলক। সরকারি নির্দেশিকা রয়েছে। সেখানে প্রধান শিক্ষকের তা নিয়েও কোনও ধারণা নেই।
স্কুলে লেখা রয়েছে, ‘সফলতার প্রথম সিঁড়ি হল শিক্ষা’। একজন প্রধান শিক্ষকের বিদ্যাসাগর নিয়ে ‘জ্ঞান’ এমন হলে, স্কুলে শিক্ষার মান কী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শুধু তাই নয়, মিড ডে মিলের চাল দেখেও চোখ কপালে উঠবে। চালের মধ্যে পোকা কিলবিল করেছে। মিড ডে মিল রান্নার মহিলা কর্মীই স্বীকার করলেন, পোকা ধরা চাল বেছে খিচুড়ি রান্না করবেন।
এদিনের ঘটনা নিয়ে ডিআই মলয় মণ্ডলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, সব শুনে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। ওই প্রধান শিক্ষক কীভাবে বিদ্যাসাগর শিক্ষক সম্মান পেলেন, তা জানতে চাওয়া হলে ডিআই বলেন, “ওই সম্মানের জন্য নিজেরাই ফর্ম পূরণ করা যায়। এরপর রাজ্য থেকে অনলাইনে ইন্টারভিউ নেওয়া হয়।” প্রধান শিক্ষকের বিদ্যাসাগর সম্পর্কে ‘জ্ঞানের পরিধি’ নিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে বিষয়টি।”