
মালদহ: আবার তৃণমূলের বাংলাদেশি গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান। লাভলি খাতুনের পর এবার চেমানি বিবি। ওবিসি সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে যাবতীয় পরিচয়পত্র সবই জাল ডকুমেন্টস দিয়ে তৈরি করেছেন। মালদহের বৈষ্ণবনগর থানা এলাকার গোলাপগঞ্জ গ্রাম পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রধান চেমানি বিবি বাংলাদেশি। যাবতীয় তথ্য প্রমাণ সহ অভিযোগ করা হয়েছে পুলিশ সুপার, বিডিও, এসডিওর কাছে। অভিযোগ যাচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকেও।
অভিযোগ, চেমানি বিবি বাংলাদেশের চাপাইনবয়াবগঞ্জের শিবগঞ্জের বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর সেখানে বিবাহ হয়। সেই নিকাহনামা আছে। তাঁর স্বামী বাংলাদেশি। ৫ বছরের শিশু সন্তান নিয়ে তিনি ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেন। পরে আবার ভারতে এসে নিকাহ করেন। তাঁর বাবার এখনও বাংলাদেশের ভোটার কার্ড আছে। আবার ভারতেও আছে। যদিও ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশন তাঁর এবং তাঁর পরিবারের সকলের নামই ডিলিট করেছে।
তাহলেও তিনি কীভাবে প্রধান থাকেন, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। ঋতব্রত তৃণমূলের জেলা সভাপতি প্রাক্তন আইপিএস প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিস্ফোরক দাবি, ২০২৩ সালে তৎকালীন জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব বাংলাদেশিদের এনে জাল ডকুমেন্টস তৈরি করে প্রার্থী করেছে। যাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে অবৈধ লেনদেন রয়েছে। দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে কেন্দ্রের এজেন্সি দিয়ে এদের জেরা করার দাবি তুলেছেন তিনি।
কী বলছেন অগ্নিমিত্রা পাল?
এই নিয়ে সরব হয়েছে বিজেপি। রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, “পঞ্চায়েত প্রধান, কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত সমিতির প্রধান, এরকম বিভিন্ন পদে বাংলাদেশির বসানো হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ঢুকলো কীভাবে? হ্যাঁ, সীমান্তে বিএসএফ রয়েছে। বিএসএফের কিছু কিছু দোষ রয়েছে। কিন্তু, ঢোকার পর পেপারগুলো কে তৈরি করে দিয়েছিল? আপনি। পঞ্চায়েতে এদের আপনি টিকিট দিয়েছেন।”
কংগ্রেসের দাবি, এভাবে বহু বাংলাদেশিকে এদেশে অবৈধভাবে এনে জাল ডকুমন্টস দিয়ে প্রার্থী করে নেতা বানিয়েছে তৃণমূল। বহরমপুরের প্রাক্তন সাংসদ অধীররঞ্জন চৌধুরী বলেন, “এরকম আরও ঘটনা থাকতে পারে। কেউ যদি প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশি হয়, সেটা সরকার দেখবে। তবে আন্দাজে বাংলাদেশি না বলে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া দরকার।”
কী বলছেন পুলিশ সুপার?
চেমানি বিবির বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। মালদহের পুলিশ সুপার অনুপম সিং বলেন, “এখানে একটা টেকনিক্যাল ব্যাপার রয়েছে। চেমানি বিবির বাবা রফিক আগে ভারতীয় ছিলেন। ৩০-৪০ বছর আগে বাংলাদেশে চলে যান। ওখানে ভোটার কার্ড করেন। বিয়ে করেন। চেমানি বিবির ওখানেই জন্ম হয়েছে। তারপর তাঁরা ২০০৬ সালে ভারতে অবৈধভাবে আসেন। চেমানি বিবির আগেও বাংলাদেশে বিয়ে হয়েছিল। তারপর এখানে এসে ভারতীয় নাগরিককে বিয়ে করেন। তারপর ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম ওঠে। অনেক টেকনিক্যাল ব্যাপার রয়েছে। আমরা সব জিনিসটা দেখছি। প্রশাসনের উচ্চস্তরে আলোচনা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া হবে। তারপর আমরা সিদ্ধান্ত নেব। আইনি পদক্ষেপ করা হবে।” বৈষ্ণবনগর এবং কালিয়াচক দুই থানাকেই তদন্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
কী বলছেন চেমানি বিবি?
তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে চেমানি বিবির বক্তব্য জানতে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে যান টিভি৯ বাংলার প্রতিনিধি। সেখানে টিভি৯ বাংলার প্রশ্নের জবাব দিতে আমতা আমতা করছিলেন চেমানি বিবি। পাশে বসা এক ব্যক্তি যা বলে দিচ্ছিলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটাই বলেন তিনি। অভিযোগ অস্বীকার করে তাঁর দাবি, “আমি এখানকারই বাসিন্দা। আমার দাদু-দিদার জন্ম এখানে। প্রধান আটকানোর জন্য এটা বলা হচ্ছে। সব মিথ্যে। এটা একটা ষড়যন্ত্র। আগে যিনি প্রধান ছিলেন, তিনি এই ষড়যন্ত্র করছেন।” SIR-এ তাঁর নাম বাদ যাওয়া নিয়ে বললেন, “আমার বাবা ও আমাদের চার ভাইবোনের নাম বাতিল হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছি। ডকুমেন্ট কোনও ভুল ছিল বলে হয়তো বাতিল করছে।” তাঁর প্রধান হওয়া নিয়ে চেমানি বিবি বলেন, “আমি তৃণমূলের প্রধান। প্রধান কীভাবে হয়, আমি জানি না। আমাকে পঞ্চায়েতের সদস্যরা প্রধান করেছে।”
প্রসঙ্গত, এর আগে মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরে তৃণমূল পরিচালিত রশিদাবাদ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান ছিলেন বাংলাদেশি লাভলি খাতুন। তিনি বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে অভিযোগ ওঠে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে তাঁর প্রধান, পঞ্চায়েতের সদস্যপদ এবং ওবিসি সার্টিফিকেট বাতিল করে প্রশাসন।