
নদিয়া: মাথার উপর নেই স্থায়ী ছাদ। রেললাইনের ধারে ছোট্ট একটি টিনের ঘরেই কোনও রকমে দিন কাটে তেরো বছরের সঞ্জু দাসের। নিয়মিত স্কুলে যাওয়াও হয়ে ওঠে না তার। কারণ পড়াশোনার পাশাপাশি অসুস্থ বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে ট্রেনে ও বিভিন্ন বাজারে চা বিক্রি করতে হয় তাকে।
ফুলিয়া স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের পাশেই ছোট্ট টিনের ঘরে বাবাকে নিয়ে বসবাস সঞ্জুর। বছর দুয়েক আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তার মায়ের। মায়ের মৃত্যুর পর বাবাই ছিলেন তার একমাত্র ভরসা। কিন্তু বছর দেড়েক আগে হঠাৎ সঞ্জুর বাবা নার্ভের সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন। বর্তমানে তিনি কার্যত শয্যাশায়ী। ঠিক মতো হাঁটাচলাও করতে পারেন না।
একসময় রাজমিস্ত্রির জোগালের কাজ করে সংসার চালাতেন সঞ্জুর বাবা। কিন্তু অসুস্থতার কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে মাত্র ১৩ বছরের এই কিশোরের কাঁধে।
বাবার সেবা-শুশ্রূষা থেকে শুরু করে বাড়ির সমস্ত কাজ—রান্না করা, ঘর ঝাঁট দেওয়া, বাসন মাজা এবং বাবার নিয়মিত মালিশ ও দেখাশোনা—সবই করতে হয় সঞ্জুকে। এর মধ্যেই চালিয়ে যেতে হয় পড়াশোনা।
সঞ্জু ফুলিয়ার শিক্ষানিকেতন বিদ্যামন্দিরের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। সপ্তাহে চার দিন স্কুলে যায় সে। বাকি তিন দিন নিজেই চা তৈরি করে ট্রেনে কিংবা বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করে সংসারের জন্য অর্থ উপার্জন করে। সেই টাকা দিয়েই কোনও রকমে বাবার ওষুধ এবং সংসারের খরচ চালানোর চেষ্টা করে ছোট্ট সঞ্জু। অভাবের কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে তার টিউশনিও। তবুও পড়াশোনা ছাড়তে চায় না সে। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখে সঞ্জু।
এরই মধ্যে নতুন করে মাথার উপর নেমে এসেছে আরও বড় বিপদ। রেলের জায়গায় বসবাস করার কারণে তাদের বাড়িতে উচ্ছেদের নোটিস দিয়ে গিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। ফলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—উচ্ছেদ হলে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে কোথায় যাবে সঞ্জু?
মাথার উপর থেকে সামান্য আশ্রয়টুকুও হারানোর আশঙ্কায় এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে বাবা-ছেলের। একদিকে অসুস্থ বাবার চিকিৎসা, অন্যদিকে সংসারের দায়িত্ব ও পড়াশোনা—সব সামলে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে মাত্র ১৩ বছরের সঞ্জু দাস।