
নদিয়া: রক্তে যাঁর দেশভক্তি, তাঁর লক্ষ্য যে দেশের কল্যাণই হবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বাবা দেশের প্রাক্তন সেনাকর্মী, তাই ছোট থেকেই দেশের প্রতি টান। সেই টান আর অদম্য মেধার জোরেই এবার দেশকে ‘আত্মনির্ভর’ করতে অভাবনীয় নজির গড়ে ফেলল নদিয়ার শান্তিপুর থানার বাবলা গোবিন্দপুরের বাসিন্দা মৃন্ময় সরকার। বর্তমানে রানাঘাট সেন্ট মেরি স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র।
আঠারোর এই তরুণ তুর্কিই নিজের ঘরেই তৈরি করে ফেলেছে অত্যাধুনিক ‘মাইক্রো টার্বোজেট ইঞ্জিন’। বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়র হয়ে দেশের স্বনির্ভরতায় নিজেকে উৎসর্গ করতে চায় মৃণ্ময়। বাবা দীর্ঘদিন সেনায় ছিলেন, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। মা ঘরের কাজের পাশাপাশি ছোটখাটো কাপড়ের ব্যবসাও সামলান।
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ছোট থেকেই মেধাবী মৃন্ময়ের টান ছিল আকাশের প্রতি। মনে জাগত কত শত প্রশ্ন! কীভাবে বিশাল এক একটা বিমান ডানা মেলে আকাশে ওড়ে? এই কৌতূহল থেকেই শুরু হয় বিকল্প কিছু তৈরির খোঁজ। নিজেই শুরু করে গবেষণা। জানতে পারে, বিমানের উড়ানের মূল চাবিকাঠিই হল ‘মাইক্রো টার্বোজেট ইঞ্জিন’। ব্যাস, চার বছর আগে থেকেই নিজের ঘরে শুরু হয়ে যায় এক নীরব বিপ্লব।
তবে ইঞ্জিন তৈরির পথটা মোটেও সহজ ছিল না। প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ চড়া দামে বাইরে থেকে কেনার সামর্থ্য বা সুযোগ কোনোটিই ছিল না। ফলে মৃন্ময় নিজেই বাড়িতে বসে তৈরি করে ফেলে বেশিরভাগ কলকব্জা। শুধু বিশেষ একটি ফুয়েল পাম্প ভারতে না মেলায়, সেটি কষ্ট করে আমেরিকা থেকে আনিয়ে নিতে হয়। দিন-রাতের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর অবশেষে মেলে সাফল্য।
এটি ড্রোন এবং ছোট বিমান, উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। রয়েছে দ্বিমুখী জ্বালানি সিস্টেম। গ্যাস এবং ইলেকট্রিক, দুই মাধ্যমেই চালানো যাবে। বাজারচলতি অন্যান্য ইঞ্জিনের তুলনায় এর উৎপাদন খরচ অত্যন্ত কম। মৃন্ময়ের এই আবিষ্কার শুধু ঘরের চার দেওয়ালে বন্দি থাকেনি। গত বছর চেন্নাইয়ে আয়োজিত জাতীয় স্তরের ‘সায়েন্স এক্সিবিশনে’ (Science Exhibition) অংশও নেয়। সেখানে দেশের বড় বড় বিজ্ঞানীদের তাক লাগিয়ে প্রথম স্থান ছিনিয়ে নেয় নদিয়ার এই কৃতি ছাত্র।
তবে মৃণ্ময় বলছেন এই ধরণের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা যেমন গৌরবের, তেমনই ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর কথায়, “সামান্য প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা হিসেবের ভুল হলেই যে কোনও সময় বড়সড় ব্লাস্ট হতে পারত। কিন্তু আমার বাবা-মা আমাকে ভয় পেতে দেননি। তাঁরা সবসময় সাহস জুগিয়েছেন। আর্থিক অভাবের মধ্যেও পাশে দাঁড়িয়েছেন।”
ছেলের এই অদম্য জেদ ও সাফল্য নিয়ে গর্বিত মা শুক্লা সরকারও। তিনি বলেন, “ঝুঁকি না নিলে তো বড় হওয়া যায় না। ও ছোট থেকেই ভীষণ দেশপ্রেমিক। বিদেশ থেকে চড়া দামে যে সব যন্ত্রাংশ ভারতকে কিনতে হয়, সেগুলো যেন ভারতেই তৈরি করা যায়, এটাই মৃন্ময়ের মূল লক্ষ্য।”