
দক্ষিণ ২৪ পরগনা: পর্যটকদের ক্যামেরা তাক করা। নদীর একেবারে ধার ঘেঁষে যাচ্ছে নৌকা। যদি সে ক্যামেরায় ধরা পড়ে! অনেকেরই তো সে ভাগ্য হয় না। হঠাৎই পিনপতন স্তব্ধতা। সাধারণত গভীর জঙ্গলে সে স্তব্ধতা থাকে। ক্যামেরা তাক। গভীর জঙ্গলে ধরা দিল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। দুলকি চালে হাঁটছিল। ভিডিয়ো হচ্ছে সে দৃশ্য। কিন্তু হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। কিন্তু কেন? সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে প্লাস্টিক বোতল দেখে থমকে দাঁড়াল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। TV9 বাংলার হাতে সেই ছবি।
সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে, দোবাঁকি ক্যাম্প থেকে কিছুটা দূরে গভীর ম্যানগ্রোভের অরণ্যে এক অভূতপূর্ব ও উদ্বেগজনক দৃশ্য দেখা গেল। প্লাস্টিকের বোতল দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। ভারত তথা বাংলার মানুষের কাছে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার সবসময়ই এক গর্বের বিষয়। বর্তমানে সুন্দরবনে প্রায় ১০৫ থেকে ১১০ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। কিন্তু তাদের বাসস্থান এখন চরম সঙ্কটে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে সুন্দরবনে মৃত ডলফিন, কচ্ছপ এবং কুমিরের পেটে ম্যাক্রো ও মাইক্রো প্লাস্টিক পাওয়া গিয়েছে। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, আগামী দিনে যদি বাঘের পেটেও এই প্লাস্টিক চলে যায়, তবে বাঘের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।
এখন প্রশ্ন হল, সুন্দরবনের এত গভীর জঙ্গলে প্লাস্টিক আসছে কোথা থেকে? এই উত্তরের অনুসন্ধান করতে গিয়ে TV9 বাংলার হাতে এসেছে এক মারাত্মক এক্সক্লুসিভ ছবি। দেখা গিয়েছে, গোসাবা বিডিও অফিস থেকে মাত্র ১ কিলোমিটারের মধ্যে, গোসাবা বাজার সংলগ্ন বিদ্যাধরী নদীতে ম্যানগ্রোভের জঙ্গলে লক্ষ লক্ষ প্লাস্টিক ও আবর্জনা ভাসছে। জোয়ার এবং ভাঁটার টানে এই প্লাস্টিকই প্রতিনিয়ত পৌঁছে যাচ্ছে সুন্দরবনের গভীর থেকে গভীরতর জঙ্গলে।
যা কার্যত সুন্দরবনের গোটা ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই প্লাস্টিক যেমন বন্যপ্রাণের পেটে যাচ্ছে, ঠিক তেমনই তা নদীর মাছের পেটে ঢুকে শেষমেশ মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে। এখানেই শেষ নয়, প্লাস্টিক ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূলে আটকে গিয়ে ছোট ছোট ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ১০ বছর ধরে এভাবেই নদীতে প্লাস্টিক ভেসে বেড়াচ্ছে। তৃণমূলের জমানায় বর্জ্য পদার্থের কোনও সঠিক ব্যবস্থাপনা বা তার বাস্তবায়ন করা হয়নি। অন্যদিকে, বোট মালিকদের অভিযোগ, বোট থেকে নদীতে প্লাস্টিক বোতল ফেলা হলে মোটা অঙ্কের টাকা জরিমানা দিতে হয়। পর্যটক পিছু প্রায় ৫০০০ টাকা পর্যন্ত এবং সেই সঙ্গে বোটের বিএলসি (BLC) ধরে জরিমানা করা হয়। এক বোট মালিক শুভজিৎ সর্দার বলছেন, “আমাদের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা থাকে। যাতে পর্যটকরা জলে কিছু না ফেলেন। ফেললেই ফাইন হয়।”
বোট মালিক ও পর্যটকদের পাল্টা প্রশ্ন— এই প্লাস্টিক ফেলা হবে কোথায়? কারণ গোসাবা ব্লকের ফরেস্ট সংলগ্ন গ্রামগুলিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনও পরিকাঠামোই নেই।
শিক্ষক তথা বিজেপি নেতা সন্দীপ মৃধা বলেন, “সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার থেকে শুরু করে বাকি জীবজন্তুদের বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হচ্ছে প্লাস্টিক। নতুন সরকারের কাছে আবেদন প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধ, প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহারের ওপর নজর দেওয়া হবে।”