
সুন্দরবন: এক হাতে জীবন, অন্য হাতে জীবিকাকে সম্বল করে পেটের টানে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন তাঁরা। গভীর জঙ্গলে বাঘের ডেরায় ঢুকে কাঁকড়া সংগ্রহ করে আনাই তাঁদের মূল পেশা। সুন্দরবনের বাসিন্দাদের কাছে অন্য কোনও বিকল্প কর্মসংস্থান বা জীবিকার সুযোগ না থাকায়, বার বার তাঁরা এই মরণফাঁদেই ছুটে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু, আজ যখন আন্তর্জাতিক বাজারে সুন্দরবনের কাঁকড়া চড়া দামে বিকোচ্ছে, তখন কাঁকড়া শিকারিদের জীবনের দাম যেন যৎসামান্য। কত ঝুঁকি নিয়ে গভীর জঙ্গলে কাঁকড়া ধরতে যেতে হয় সুন্দরবনের মানুষকে, সেই ছবি ধরা পড়ল টিভি৯ বাংলার ক্য়ামেরায়।
বিশ্বজুড়ে সুন্দরবনের কাঁকড়ার বিপুল চাহিদা-
সুন্দরবন অঞ্চলের উন্নত মানের কাদা কাঁকড়া (Scylla serrata এবং Scylla olivacea) আজ বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত বিখ্যাত। প্রতি বছর সুন্দরবন থেকে প্রায় ৫০০ টনেরও বেশি কাঁকড়া সরাসরি ভারতের বাইরে বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে আকার এবং ঋতুর ওপর ভিত্তি করে এই কাঁকড়ার দাম প্রতি কেজিতে ৮ থেকে ২৫ মার্কিন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৭০০ থেকে ২,১০০ টাকা) পর্যন্ত হয়ে থাকে। বর্তমানে ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কাঁকড়ার বাজার প্রায় ৪২৪.৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছে গিয়েছে। ২০৩৩ সালের মধ্যে এই বাজার আরও বহুগুণ বৃদ্ধির পূর্বাভাস রয়েছে।
যেসব দেশে রফতানি হয় সুন্দরবনের কাঁকড়া-
সুন্দরবনের এই কাঁকড়া প্রধানত পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের বাজারে চড়া দামে বিক্রি হয়।
পূর্ব এশিয়া: চিন (প্রধানত বেজিং, সাংহাই এবং কুনমিং), জাপান, তাইওয়ান এবং দক্ষিণ কোরিয়া।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়া। ইউরোপ ও অন্যান্য মহাদেশ: যুক্তরাজ্য (UK), বেলজিয়াম, জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডস। এই দেশগুলিতে সুন্দরবনের প্রক্রিয়াজাত ‘সফট-শেল’ (Soft-shell) কাঁকড়ার বিপুল চাহিদা রয়েছে।
মা বনবিবির ভরসায় অনিশ্চিত যাত্রা-
বিশ্বজুড়ে সুন্দরবনের কাঁকড়া যাঁরা পৌঁছে দেন, তাঁদের জীবন কেমন কাটে? কাঁকড়া ধরতে গিয়ে ফিরবেন কি না, তা তাঁরা জানেন না বলে আশঙ্কার কথা শোনালেন কাঁকড়া শিকারিরা। বলছেন, পেটের দায়ের ঘরের পুরুষেরা রওনা দেন গভীর জঙ্গলে। যাওয়ার আগে নদীপাড়ে ‘মা বনবিবি’-র পুজো দিয়ে আশীর্বাদ চেয়ে নেন তাঁরা। কেউ ৭ থেকে ১৫ দিন, আবার কেউ বা টানা এক মাসের জন্য নৌকা নিয়ে চলে যান সুন্দরবনের গহীন খাঁড়িতে। যাওয়ার সময় পরিবারের কেউ জানেন না, ঘরের মানুষটি জ্যান্ত ফিরে আসবেন কি না!
কাঁকড়ার দাম বাড়লেও বাড়েনি মানুষের ‘দাম’-
বিশ্ব বাজারে সুন্দরবনের কাঁকড়ার আকাশছোঁয়া দাম থাকলেও, যাঁরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে এই কাঁকড়া ধরছেন, সেই মৎস্যজীবী বা কাঁকড়া শিকারিদের ভাগ্যের কোনও পরিবর্তন হয়নি। আজও তাঁরা চূড়ান্ত অসহায়ভাবে ছোট কুঁড়েঘরে দিন কাটান। জঙ্গলে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে প্রতি বছর বহু মানুষ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আক্রমণের শিকার হন। পিছন থেকে অতর্কিতে আসা বাঘের থাবায় প্রাণ হারিয়েছেন বহু মৎস্যজীবী। এর ফলে সুন্দরবনের বহু পরিবার বার বার নিঃস্ব ও অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। এই ২০২৬ সালেই মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে ৫ জন মানুষ বাঘের পেটে গিয়েছেন এবং চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত মোট ৯ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
তৃণমূল আমলে সরকারি সাহায্য নিয়ে টালবাহানা-
সুন্দরবনের মানুষ বলছেন, বাঘের আক্রমণে মৎস্যজীবীদের মৃত্যুর পর সরকারি ক্ষতিপূরণ বা সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্রে এতদিন চরম টালবাহানা সহ্য করতে হয়েছে পরিবারগুলিকে। আইনি জটিলতা এবং বৈধ ‘পাশ’ (Permit) সংক্রান্ত সমস্যার অজুহাতে অনেকেই কোনও সরকারি সাহায্য পান না। কেউ পেয়েছেন, আবার কেউ বঞ্চিত থেকে গিয়েছেন।
গভীর জঙ্গলে কাঁকড়া ধরতে রওনা দেওয়ার আগে গোপাল মিস্ত্রি নামে এক কাঁকড়া শিকারি বললেন, “কাঁকড়া ধরতে গেলে অনেক রিস্ক থাকে। কিন্তু, আমাদের মাছ-কাঁকড়া ধরেই জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। ফরেস্ট থেকে অনুমতি নিয়ে আমরা সুন্দরবনের জঙ্গলে ঢুকি। সাতদিন পর ফিরি। এখানে সবাই আমরা মাছ-কাঁকড়া ধরেই জীবিকা নির্বাহ করি।” তাঁদের বুক চিরে যেন একটাই কথা বেরিয়ে আসছে, ‘মানুষের জীবনের চেয়ে কাঁকড়ার দাম অনেক বেশি।’