
কমলেশ চৌধুরীর রিপোর্ট
‘জলবোমা’য় তছনছ নেপাল। ভাদ্রের নীল আকাশের নীচে এমন বিপর্যয় দেখে তাজ্জব দুনিয়া। বৃষ্টি নেই, মেঘভাঙা বৃষ্টি তো দূর! তাহলে বিপুল জলরাশি এল কোত্থেকে? নেপাল বিপর্যয় নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে এই প্রশ্নটাই। আচমকা ‘জলবোমা’ ফাটল কেন?
গোড়া থেকেই কাঠগড়ায় ‘তুষারধস’। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোও আগে-পরের উপগ্রহ চিত্র খতিয়ে জানিয়ে দিল, ভিলেন হিমবাহ-ভাঙা ‘তুষারধস’ই। ইংরেজিতে, Ice Avalanche। তবে ঘটনাক্রমে ‘পরিবর্তন’। শুরুতে মনে করা হয়েছিল, বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্পই তুষারধসের নেপথ্যে। ভূমিকম্পের তথ্য আসায় ভাবা হয়েছিল, মাটি কাঁপতেই ভেঙে পড়ে হিমবাহের টুকরো! কিন্তু পরে মার্কিন ভূতত্ত্ব সর্বেক্ষণ জানিয়ে দেয়, আমাদের চিরচেনা ‘ভূমিকম্প’ হয়নি। ৫.২ মাত্রার যে কম্পন রেকর্ড হয়েছে, তার কারণ ওই তুষারধসই। নেপথ্যে তুষারধসের ‘ওজন’!
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল শুগার উপগ্রহ চিত্র ছানবিন করে জানিয়েছেন, ছোটখাট নয়, বিরাট মাপের হিমবাহ-টুকরো ভেঙে পড়ে বুধবার। হিমবাহ-টুকরোর মাপ চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো। শুগারের দেওয়া হিসেব, ২০০০ ফুট চওড়া হিমবাহ-টুকরো সটান ৪০০০ ফুট নীচে আছড়ে পড়ে। গোটা ঘটনাটা ঘটেছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭০০০ ফুট উঁচুতে। অর্থাৎ, মূল হিমবাহ রয়েছে ১৭০০০ ফুটে, তার থেকে বিশালাকার টুকরো ভেঙে পড়েছে ১৩ হাজার ফুটে! এ যেন উপত্যকায় ‘বম্বিং’!
শুগারের ব্যাখ্যা, ওই বিশাল চেহারার টুকরো তিব্বতের লেন্ডে নদীতে ভেঙে পড়তেই জল, বরফ, কাদা, পাথর, বোল্ডার মিশে মুহূর্তের মধ্যে ‘জলবোমা’র আকার নেয়। যেহেতু পাহাড়ি নদীর ঢাল বেশি, চোখের পলকে, দু’কুল ভাসিয়ে, বলা ভালো দু’কুল ধ্বংস করতে করতে নামে ‘জলবোমা’। পাহাড় এতটাই খাড়াই, নদীর জলস্তরের উচ্চতা বাড়তে বিশেষ সময় লাগেনি। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট-এর বিজ্ঞানীরা বলছেন, নেপালের গালচির কাছে ৩০ মিনিটেই ত্রিশূলি নদীর জলস্তর ৯ মিটার বেড়ে যায়, মালেখুর কাছে আধ ঘণ্টায় জলস্তর বেড়ে যায় অন্তত ৭ মিটার। বিভিন্ন ভাইরাল ভিডিও আর এই অঙ্ক বুঝিয়ে দিচ্ছে, নদীপাড়ের মানুষজনকে পালানোর বিন্দুমাত্র সময় দেয়নি খ্যাপা প্রকৃতি। আশঙ্কা, কয়েক হাজার চাপা পড়েছেন ধ্বংসস্তূপের নীচেই। আদৌ কোনও দিন খোঁজ মিলবে কি না, সন্দেহ তা নিয়েও।
এখানে মানুষের ভূমিকা কতটা?
অনেকটাই। প্রথমত, হিমবাহ ভাঙার জন্য বিশ্ব উষ্ণায়নকেই দায়ী করছেন পরিবেশবিজ্ঞানীরা।আর রাষ্ট্রপুঞ্জ তো কবেই বলেছে, বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য মানুষের কৃতকর্মই দায়ী।
দ্বিতীয়ত, পাহাড়ি নদী মানেই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ছড়াছড়ি। তা সে ভারত হোক বা চিন বা নেপাল। নেপালের পাহাড়ি পথে ২০টি সেতুর সঙ্গে ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ভেসে গিয়েছে। এর বেশ কয়েকটিই কর্মক্ষম ছিল। অর্থাৎ, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধে জল জমানো ছিল। বাঁধ ভাঙায় সেই জমানো জল ‘জলবোমা’র তেজ আরও বাড়িয়েছে। ২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডের চামোলিতেও হিমবাহ-ভাঙা তুষারধসে ভয়াল হড়পা বান নামে। সেদিনও ধ্বংস হয়ে যায় ধৌলিগঙ্গার জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। তাতে আরও আগ্রাসী হয়ে ওঠে হড়পা বান। ২০২৩ সালের সিকিম বিপর্যয়েও তাই। ধ্বংস হয়ে যায় চুংথাং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প।
তৃতীয়ত, নিয়ম চুলোয় দিয়ে নদীর ধারে, এমনকী নদীখাতে বাড়ি, বহুতল! নদীর প্লাবনভূমি ফাঁকা থাকলে, ধ্বংসাবশেষের নীচে চাপা পড়তে হত না এত বাড়িঘরদোরকে। এ যেন গত অগাস্টের উত্তরাখণ্ডের ধরালি বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি। তবে ব্যাপ্তি বহু গুণ বেশি।
বুধবার যে অঞ্চলে বন্যা হয়েছে, সেই রসুয়াতে গত বছর জুলাই মাসেও বন্যা হয়েছে। কারণ ছিল লেক-ফাটা বিপর্যয়। এবার তুষারধসের পাশাপাশি লেক-ফাটা বিপর্যয়ের ভূমিকা কতটা, খতিয়ে দেখছেন তাবড় বিজ্ঞানীরা। ড্যানিয়েল শুগারের কথায়, ‘জলবোমার যে ছবি দেখেছি, তাতে এর পিছনে আরও কোনও কালপ্রিট থাকলেও অবাক হব না!’