
কালীপুজো বা দীপাবলির সময় যত এগিয়ে আসে, ততই আমাদের মনে পড়ে বুড়িমার কথা। বুড়িমার চকলেট বোম। আর শব্দবাজি নিষিদ্ধ হলেও আতশবাজিও কিন্তু তৈরি করে এই ‘বুড়িমা’। তিনি আমার-আপনার কাছেও বুড়িমা, আবার আমাদের বাবা-কাকার কাছেও বুড়িমা। সকলের কাছেই তার পরিচয় বুড়িমা। কিন্তু বাজির সাম্রাজ্যের বুড়িমাকে চেনেন?
একটা সময় ছিল যখন ডেসিবল ধরে শব্দের তীব্রতা সেভাবে মাপা হত না। আর তখন বুড়িমার চকলেট বোমা ছাড়া কালীপুজো লাগত অনেকটাই ফিকে। বাচ্চা থেকে বুড়ো, সকলেই মজে থাকত এই শব্দবাজিতে। তবে শুধুমাত্র কালীপুজো নয়, যে কোনও আনন্দে, উৎসবে ভরসা ছিল এই বুড়িমাই। কত ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচে সচিন-সৌরভের ভারতের জয়ের পর পাড়ায় পাড়ায় ফেটেছে বুড়িমা। যদিও সেই ট্রেন্ড ক্রমশ কমেছে ধোনি-রোহিত-কোহলির আমলে।
সকলের ‘বুড়িমা’। তাঁর আসল নাম অন্নপূর্ণা দাস। জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায়। দেশভাগের সময় ভিটেমাটি ছেড়ে ওপার থেকে চলে আসেন এই পারে। তিন মেয়ে এক ছেলেকে নিয়ে আশ্রয় নেন তৎকালীন দিনাজপুর জেলার ধলদিঘি সরকারি ক্যাম্পে। সেখান থেকে তিনি চলে আসেন হাওড়ার বেলুড়ে। সেখানেই স্থায়ী ঠিকানা তৈরি হয় তাঁর। গরিব ঘরের অভাবী মানুষ, সেই শুরু হয় তাঁর লড়াই। আর সেখান থেকেই পরবর্তী জীবনে হয়ে ওঠেন সফল ব্যবসায়ী ‘বুড়িমা’।
ওপার বাংলায় থাকাকালীনই মৃত্যু হয় স্বামী সুরেন্দ্রনাথের। তারপর দেশভাগ। এপারে এসে সরকারি ক্যাম্প থেকে তিনি চলে যান দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরে। সেখানে থাকাকালীনই সংসারের হাল ধরার জন্য শিখলেন বিড়ি বাঁধার কাজ। ছোট একটা কারখানাও গড়ে তোলেন তিনি, জানা যায় এমন কথাই।
তবে বেশি দিন গঙ্গারামপুরে থাকা হয়নি তাঁর। সেখানে থাকতেই এক মেয়ের বিয়ে দেন হাওড়ার বেলুড়ে। আর সেই সূত্রেই বেলুড়ের প্যারীমোহন মুখার্জি স্ট্রিটে একটা দোকানঘর ভাড়া নিয়ে শুরু করেন নতুন ব্যবসা। প্রথমে আলতা-সিঁদুরের ব্যবসা করতেন তিনি। তার পাশাপাশি বিশ্বকর্মা পুজো থেকে নবান্নের সময় ঘুড়ি, দোলের সময় রঙ বা কালীপুজোর সময় বাজির ব্যবসা শুরু করেন তিনি। তখন বাজি তৈরি করতেন না তিনি। বাজি কিনে এনে বিক্রি করতেন তিনি।
বাজির ব্যবসায় লাভ বেশ ভাল দেখে তিনি ভাবলেন নিজে যদি বাজি তৈরি করা যায়, তাহলে রোজগার আরও বেশি হবে। আর, যেমন ভাবা, তেমনই কাজ। বাকি ববসা ছেড়ে শুধু বাজির ব্যবসায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি। বাড়ির কাছাকাছি বাঁকড়া থেকে গঙ্গা পেরিয়ে নুঙ্গি বা বজবজ ঘুরে ঘুরে তিনি শিখলেন কীভাবে বাজি তৈরি করতে হয়। কিন্তু ততদিনে বয়স হয়েছে তাঁর। কিন্তু কিছু করে দেখানোর তাগিদে টেক্কা দিতেন তরুণদেরও।
তারপরই নিজেই শুরু করেন বাজি উৎপাদন। জানা যায়, বাঁকড়ার আকবর আলি নামের এক ব্যক্তি হাতে ধরে তাঁকে চকলেট বোম বানানো শেখান। তারপর বোমের শব্দের মতোই দূর দুরান্তে ছড়িয়ে পড়তে থাকে তাঁর নাম। সেই সময় তাঁর দোকানে যাঁরা বাজি কিনতে আসতেন অন্নপূর্ণা দেবীকে ডাকতেন বুড়িমা বলে। আর সেখান থেকেই তিনি তাঁর বাজির ব্যবসার নামকরণ করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বুড়িমা হয়ে ওঠে একটা ব্র্যান্ড। সবচেয়ে বেশি নাম ছড়িয়ে পড়ে বুড়িমার চকলেট বোমের। বর্তমানে ডানকুনি, নুঙ্গি, চম্পাহাটি ও তামিলনাড়ুর শিবকাশীতে কারখানা রয়েছে ‘বুড়িমা’র।
১৯৯৫ সালে মৃত্যু হয় অন্নপূর্ণা দেবীর। বর্তমানে ‘বুড়িমা’র বাজির ব্যবসা চালান তাঁর দুই নাতি সুমন দাস ও রমন দাস। এ ছাড়াও তাঁদের সঙ্গে ব্যবসা সামলান সুমন দাসের ছেলে সুমিত দাস। শব্দদূষণের কারণে চকোলেট বোম এখন লুপ্তপ্রায়। কিন্তু দেশলাই ও অন্যান্য আতশবাজি তৈরি করে ‘বুড়িমা ফায়ার ওয়ার্কস’। বুড়িমা সত্যিই অন্নপূর্ণা যিনি একাধিক ভাবে নিজের পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছেন। আজ ‘বুড়িমা’ অন্নপূর্ণা দাসকে শুধুমাত্র একজন উদ্যোগপতি মনে করলে ভুল করা হবে। তিনি আসলে বাংলার বাজির বাজারে হয়ে উঠেছেন একজন ‘কিংবদন্তি’।