
নয়া দিল্লি: দীর্ঘদিনের সংঘাতে অবশেষে দাঁড়ি টানতে চলেছে আমেরিকা ও ইরান (Iran-US Peace Deal)। দুই দেশ ইতিমধ্যেই চুক্তির খসড়ায় সই করেছেন। আনুষ্ঠানিক সই-সাবুদ রয়েছে চলতি সপ্তাহের শুক্রবার। চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার খবর সামনে আসতেই আন্তর্জাতিক বাজার ফের চাঙ্গা হতে শুরু করেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। দুই দেশের শান্তি চুক্তি ভারতের অর্থনীতির জন্যও বড় স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি কার্যকর হলে জ্বালানির খরচ কমবে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য (Benefits of Iran-US Peace Deal) আরও সহজ হবে এবং পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে ভারতের রফতানি বৃদ্ধি পাবে। একইসঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কাও কমতে পারে।
আগামী ১৯ জুন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এই শান্তি চুক্তিতে আনুষ্ঠানিক সই-সাবুদ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রায় ১০৭ দিন ধরে চলা আমেরিকা-ইরান সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়েছিল। হরমুজ় প্রণালী বন্ধ থাকায় জ্বালানি ঘাটতির পরিস্থিতি তৈরি হয়। গ্যাসের দাম বাড়ে। বেড়েছে পেট্রোল-ডিজ়েলের দামও। কেন্দ্রের তরফে সিলিন্ডার ডেলিভারিতেও নিয়ন্ত্রণ আনা হয়। তবে, পশ্চিম এশিয়ার আকাশে যুদ্ধের মেঘ কেটে গিয়েছে। হরমুজও এই সপ্তাহে সম্পূর্ণ খুলে যাবে। দুই দেশের চুক্তির ফলে ভারত কী কী সুবিধা পেতে পারে, দেখে নেওয়া যাক
অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা GTRI-এর মতে, ভারতের জন্য এই চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংঘাত চলাকালীন উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় ভারতের জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়ে গিয়েছিল। ফলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ বাড়ে, টাকার উপর চাপ তৈরি হয় এবং বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হয় তেল শোধনাগারগুলি। সেক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণভাবে খুলে গেলে আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার স্থিতিশীল হবে। তেল ও গ্যাসের দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে, ভারতীয় মুদ্রা শক্তিশালী হবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও অনুকূল হয়ে উঠবে।
GTRI-এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব জানিয়েছেন, দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই পশ্চিম এশিয়ার উপর নির্ভরশীল। ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৫০ শতাংশ, এলপিজি সরবরাহের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং এলএনজি আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশ পশ্চিম এশিয়া থেকে আসে। সেক্ষেত্রে এই চুক্তি ভারতের জন্য অর্থনৈতিক স্বস্তি দিতে পারে। বাণিজ্য দফতরের সচিব রাজেশ আগরওয়াল জানিয়েছেন, শান্তি চুক্তি দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একাধিক বাধা দূর হবে।
গাল্ফ কোঅপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি-র দেশগুলিতে ভারতের প্রধান রফতানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন খাদ্যশস্য, পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য, চাল, মাংস, সামুদ্রিক পণ্য, রত্ন ও গয়না, রাসায়নিক দ্রব্য, ওষুধ, বস্ত্র এবং যন্ত্রপাতি। অন্যদিকে, ভারত এইসব অঞ্চল থেকে মূলত অপরিশোধিত তেল, এলএনজি, এলপিজি, পেট্রোকেমিক্যালস, সার, প্লাস্টিক এবং অন্যান্য খনিজ জ্বালানি আমদানি করে।
আমেরিকা-ইরান শান্তি চুক্তির ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, শেয়ার বাজারও চাঙ্গা হয়েছে। ভারতীয় মুদ্রাও শক্তিশালী হয়েছে। ১৫ জুন অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি প্রায় ৮৩-৮৪ ডলারে নেমে এসেছে। যা প্রায় তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।
তেলের দাম কমায় ভারতের আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ কমেছে। ফলে মার্কিন ডলারের তুলনায় শক্তিশালী হচ্ছে ভারতীয় মুদ্রা। একদিনেই মার্কিন ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকা প্রায় ০.৭ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছে। দিনের শুরুতে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য ছিল ৯৫.৩২। দিনের শেষে ৯৫.১১-তে দাঁড়ায় টাকার মূল্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়িত হলে শুধু জ্বালানি বাজার নয়, ভারতের সামগ্রিক অর্থনীতি, বাণিজ্য ও মূল্যস্ফীতির উপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।